আজও অবাক বিষ্ময়ে আমরা তার দিকে তাকিয়ে থাকি। তার মনীষার কান্তি আমাদেরকে মুগ্ধ করে, বিমোহিত করে। তার ভেতরে যে প্রদীপ্ত প্রতিভা ও প্রভার বিচ্ছুরণ ঘটেছিল তা খুব বেশি দেখা যায়নি অন্তত এই বঙ্গজীবন ও জনপদে। জ্ঞানের সঙ্গে তার আত্মার একটি আত্মীক সংযোগ গড়ে উঠেছিল, গড়ে উঠেছিল নিবিড় বন্ধন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি তার শিক্ষক হরিনাথ দে এর সংস্পর্শে আসেন। আবার মহসীন কলেজে এসেও ঐ শিক্ষককে অধ্যক্ষ হিসেবে পেয়েছিলেন। এই হরিনাথ দে শহীদুল্লাহকে স্কুল জীবন থেকেই স্নেহ করতেন। এই শিক্ষক তাকে পাঠযোগ্য বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতেন। আর শহীদুল্লাহ সেই তালিকা অনুযায়ী রাত ৮/৯ পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে (বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি) বসে অধ্যয়ন করতেন। সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হোন। মুসলমান ছাত্র হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম সংস্কৃত নিয়ে অনার্স (১৯১০) পাস করেন এমনকি বেদের প্রশ্নপত্রে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ফলে চারদিকে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। মূলত স্কুল জীবন থেকেই নানা ভাষার নানা গ্রন্থের প্রতি তার আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা গড়ে উঠতে থাকে যার প্রভাব ও প্রতিফলন দেখা যায় তার পরবর্তী জীবনে।
দুই
অনার্সের পর শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও আইনে এম এ পড়া শুরু (১৯১০) করেন। মাসদুয়েক ভালোই কাটলো। তৃতীয় মাসে বেদের অধ্যাপক হয়ে এলেন সংস্কৃত পণ্ডিত সত্যব্রত সামশ্রমী। তিনি মুসলিম ছাত্রকে বেদ পড়াতে অস্বীকার করেন। এমনকি ম্লেচ্ছ বলে তাকে বেদ পড়া ছেড়ে দিতে নির্দেশ করেন। এহেন অবস্থায় কলেজ জীবনের অধ্যাপক ড. সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ তাকে প্রাইভেটে সংস্কৃত পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দেন। শহীদুল্লাহ আরো উত্তম পরামর্শের জন্য চলে যান তার হরিনাথ দে এর নিকট। বিস্তারিত শুনে হরিনাথ দে নিদারুণভাবে ব্যথিত হলেন। সেই সাথে প্রিয় ছাত্র শহীদুল্লাহকে প্রাইভেটে সংস্কৃতে পরীক্ষা দিতে নিষেধ করেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন- ‘খাতা সেই কট্টর ব্রাহ্মণ অধ্যাপকের হাতেই পড়বে এবং খাতার ওপর মুসলমানী নাম দেখলেই তাদের ভেতরের জন্তুটা লিকলিকিয়ে উঠবে- ফেল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।’ তাই হরিনাথ দে তাকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ পড়ার পরাশর্ম দিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নামে কোন বিভাগ ছিল না। এবার কেবল মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগ খোলা হয়। শহীদুল্লাহ ছিলেন এই বিভাগে এই বিষয়ের প্রথম শিক্ষার্থী।
তিন
বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়ার সুযোগ না পেলেও সংস্কৃত ভাষার প্রতি তার ভালোবাসা অটুট ছিল। এবং তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সুযোগও এসে যায়। ভারত সরকার জামার্নে সংস্কৃত শেখার জন্য একটি বৃত্তির ঘোষণা দেয়। বিজ্ঞপ্তি দেখা মাত্র শহীদুল্লাহ সাথে সাথে আবেদন করে ফেলেন। এমনকি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে শহীদুল্লাহ বৃত্তিটিও পেয়ে যান। কিন্তু বিধি বাম। স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট তার বিপক্ষে যায়। আজহার উদ্দীন খান ‘বাংলা সাহিত্যে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’ (১৯৬৮) গ্রন্থে লিখছেন- ‘স্বাস্থ্য তার বরাবর ভাল ছিল, কিন্তু ঘুষ না দেওয়ার দরুণ রিপোর্ট তার বিপক্ষে গেল।’ যদিও শহীদুল্লাহ অপর একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট আনিয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে জার্মানে তার ভর্তির তারিখ পার হয়ে যায়।
চার
আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় এমএ পড়ার সময় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটি মুসলিম এতিমখানার ম্যানেজারির দায়িত্ব পালন করেন। ইতোপূর্বে যশোর জেলা স্কুলে (১৯০৮) কিছুদিন শিক্ষকতার কাজ করেছিলেন। মাওলানা মনিরুজ্জামানের অনুরোধে সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) হাইস্কুলেও (১৯১৪) বছরখানেক তিনি শিক্ষকতার কাজ করেন। একসময় শিক্ষকতা ছেড়ে (১৯১৫) ২৪ পরগণার বসিরহাট কোটে শহীদুল্লাহ ওকালতি শুরু করেন। এই বসিরহাটের পেয়ারা গ্রামে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১০ জুলাই (১৮৮৫) শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন। মূলত সরকারি কাজে স্বাধীনতা থাকে না বলেই শহীদুল্লাহ সরকারি স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে ওকালতিতে চলে আসেন। কিন্তু ওকালতিতে এসে দেখলেনÑএখানে সত্যের বিন্দুমাত্র বালাই নেই। এখানে রাতকে দিন দিনকে রাত করা হয়। ওকালতি ভালোভাবে চললেও সুকুমারবৃত্তি চর্চার অভাবে ঐ সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ অঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠছিলেন। এদিকে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধনিবন্ধ পাঠ করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মুগ্ধ হয়ে শহীদুল্লাহকে লিখলেন- Shahidullah, bar is not you, come to University’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ টাকা বেতনে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের গবেষণা সহকারী হিসেবে তিনি কাজ যোগদান (১৯১৯) করেন। এই নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ কোন বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করেনি। কাজের জন্য শহীদুল্লাহও কোনো আবেদনপত্র সাবমিট করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সেদিন সরাসরি শহীদুল্লাহর কাছে নিয়োগপত্র পাঠিয়েছিলেন।
পাঁচ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত (১৯২১) হলে শহীদুল্লাহর কাছে ৪০০ টাকা বেতনের প্রস্তাব আসে। তখন শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫০ টাকা বেতন পেতেন। বড় পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিন শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলেন। সঙ্গে এলেন আরো অনেকে। বিষয়টি নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেন তার ‘আশুতোষ স্মৃতিকথা’ (১৯৩৬) গ্রন্থে বেশ বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এদিকে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ থেকে অবসর (১৯২৪) নিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। নিয়ম অনুযায়ী তখন এই বিভাগের অধ্যক্ষ হওয়ার কথা মুহম্মদ শহীদুল্লাহর। কিন্তু বিদেশি ডিগ্রি না থাকায় তিনি অধ্যক্ষ হতে পারলেন না; অধ্যক্ষ হলেন শ্রীশচন্দ্র চক্রবর্তী। শহীদুল্লাহ আত্মমর্যাদার সঙ্গে মাথা উচু করে চলতে চান। একবার তিনি সরকারি বৃত্তি পেয়েও ডাক্তারি রিপোর্টের কারণে জার্মানি যেতে পারেননি। এবার তিনি টাকা ধার করে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান (১৯২৬)। প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বৈদিক, প্রাচীন পারসিক ও তিব্বতী ভাষার তুলনামূলক অধ্যয়ন করেন। বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বপ্রথম ভারতীয় হিসেবে ডি—লিট ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণাগ্রন্থ- ‘Les Chants Mystiques de Kanna at de Saraha’ শিরোনামে প্যারিস থেকে ফরাসি ভাষায় প্রকাশ (১৯২৮) হয়। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিবিজ্ঞানে গবেষণা করে এশিয়ার মধ্যে সর্বপ্রথম শহীদুল্লাহ ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করে। ডিগ্রি শেষে ঢাকায় ফিরে এলেও (১৯২৮) উচ্চশিক্ষার জন্য আবারও প্যারিসে ফিরে যান। এবং চর্যাপদের ধর্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছয়
ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের বাংলা বিভাগের সিলেবাস তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কাছে জ্ঞান অর্জন ছিল সাধনার মতো। এই সাধনায় তিনি এমনভাবে লেগে থাকতেন যে, খাওয়ার কথা ভুলে যেতেন। ঐ কলেজ জীবন থেকেই ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে (ন্যাশনাল লাইব্রেরি) তার যে পাঠ অভ্যাস গড়ে উঠেছিল আজীবন এই অভ্যাস ও আকাক্সক্ষা তিনি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। একবার বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কখন বন্ধ হয়ে যায় তিনি টের পাননি। চেঁচামেচিতে রাতের দারোয়ান গ্রন্থাগারিকের কাছ থেকে চাবি এনে তাকে উদ্ধার করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের (১৯৪৪) পর বছর কয়েক (১৯৪৪—১৯৪৮) তিনি আজিজুল হক কলেজে (বগুড়া) অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। দেশভাগের সময় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় অনেক শোচনীয় অবস্থা থেকে কলেজটিকে তিনি প্রথম শ্রেণির প্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি আবারও (১৯৪৮) বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। এখানকার পাঠ্যসূচি প্রণয়নসহ নানা কাজের সঙ্গে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বছর তিনেক পর (১৯৫৮) অবসর নিয়ে তিনি করাচি উর্দু উন্নয়ন বোর্ডের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এরপর বাংলা একাডেমির ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ সম্পাদনার কাজ করেন। এ ছাড়া আদমজি সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার বোর্ডের প্রধান বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। আজীবন এই মনীষী নিজেকে মননশীল ও সৃজনশীল কাজে নিজেকে দারুণভাবে সম্পৃক্ত রাখতে পেরেছিলেন।
সাত
লেখাটি শেষ করবো একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে। কাজী মোতাহার হোসেনকে তার ‘স্মৃতিকথা’য় লিখতে দেখা যায়- রমেশচন্দ্র মজুমদারের ছোটছেলে একদিন চিৎকার করে বলে ওঠে- ‘মা! মা! দেখ কেমন করে একটা ছাতা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে!’ মা তাকিয়ে দেখলেন, সত্যিই মানুষ দেখা যাচ্ছে না, শুধু ছাতাই দেখা যাচ্ছে! যা হোক, ঐ ছাতা হাঁটতে হাঁটতে যখন রমেচন্দ্রের বারান্দায় উঠে আসলো, তখন দেখা গেল, এর নীচে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। দৈহিক উঁচ্চুতায় কিছুটা কম হলেও মন ও মননের দিক থেকে তিনি ছিলেন পাটক্ষেতে দণ্ডায়মান একটি বটবৃক্ষের মতো। এই জুলাই মাসে এই মহান মনীষীর জন্ম আবার এই জুলাই মাসে তার জীবনের অবসান ঘটে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এই ছোট্ট নিবেদন।
ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ, পাবনা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন