দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান সম্প্রতি বেসরকারি একটি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খোলে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ-প্লাস পাওয়ায় আশিককে ওই ব্যাংক থেকে মাসিক বৃত্তি দেওয়া হয়। মূলত এই বৃত্তির টাকা জমাতেই সে ব্যাংক হিসাব খুলেছে। আশিকুর রহমানের মতো দেশের অর্ধকোটি শিক্ষার্থীর বর্তমানে ব্যাংক হিসাব রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার পরিমাণ বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে টাকা জমা অর্থাৎ, আমানতের পরিমাণও। ‘স্কুল ব্যাংকিং’ বা ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ নামে পরিচিত এই খাতে হিসাব খোলা ও আমানত সংগ্রহের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ; আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে কার্যরত ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংক ‘স্কুল ব্যাংকিং’ বা ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং’ সেবা দিচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে শিক্ষার্থীদের মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ লাখ ৭৩ হাজার। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এক বছর আগেও এই চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ছিল ৪৪ লাখ ৮০ হাজার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৮ লাখ নতুন শিক্ষার্থী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। প্রবৃদ্ধির হিসাবে যা প্রায় ৪০ শতাংশ। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের আমানতের পরিমাণও ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ, শুধু হিসাবই বাড়েনি, শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানত সংগ্রহ উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটিতে শিক্ষার্থীদের মোট হিসাবের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৯৮ হাজার এবং এসব হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ৫৭৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটিতে শিক্ষার্থীদের হিসাবের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৮ হাজার এবং আমানতের পরিমাণ ৪৩২ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার কারণে এ দুই ব্যাংক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকও স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকে প্রায় ৫ লাখ এবং রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকে সাড়ে ৩ লাখের কাছাকাছি শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শহরাঞ্চল এখনো এগিয়ে রয়েছে। মোট হিসাবের প্রায় ৫৬ শতাংশ শহরের শিক্ষার্থীদের নামে এবং ৪৪ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীদের নামে খোলা হয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলেও ব্যাংকিং সেবার বিস্তার বাড়ছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে গ্রামীণ এলাকায় হিসাব বৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশ হলেও শহরে এই হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, শহরের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি হারে ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ছেলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা এগিয়ে। মোট হিসাবের ৫৩ শতাংশ ছেলেদের এবং প্রায় ৪৭ শতাংশ মেয়েদের নামে। আমানতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মোট আমানতের ৫৭ শতাংশ রয়েছে ছেলে শিক্ষার্থীদের হিসাবে এবং বাকি ৪৩ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থীদের হিসাবে।
শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তনকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি জারি করা নতুন নির্দেশনায় স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ১৮ বছর থেকে বাড়িয়ে ২৫ বছর করা হয়। এর ফলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীও এই সুবিধার আওতায় আসেন। নতুন নির্দেশনা কার্যকরের পর প্রথম প্রান্তিকেই ১৩ লাখ ৪২ হাজার নতুন শিক্ষার্থী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে, দেশের প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে আশপাশের অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে হবে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, ক্যাম্পেইন এবং হিসাব খোলার বিশেষ উদ্যোগও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত অল্প বয়স থেকেই শিশু-কিশোরদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং ব্যাংকিং সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে। এই হিসাব পরিচালনায় কোনো সার্ভিস চার্জ বা মাশুল দিতে হয় না। মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়ে হিসাব খোলা যায়। নির্ধারিত সীমার মধ্যে ডেবিট কার্ড, এসএমএস ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধাও পাওয়া যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই ডিজিটাল আর্থিক সেবার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যেও এ ধরনের হিসাবের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। রাজধানীর মগবাজার এলাকার বাসিন্দা ইয়াসির আরাফাত জানান, তার সন্তানের বয়স এখন ৭ বছর। পাঁচ বছর বয়সেই সন্তানের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। প্রতি মাসে কিছু অর্থ সেখানে জমা রাখেন। পাশাপাশি জন্মদিন বা বিভিন্ন উপলক্ষে সন্তান যে অর্থ উপহার পায়, সেটিও ওই হিসাবে জমা করা হয়। তার বিশ্বাস, এতে সন্তান ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের গুরুত্ব বুঝতে শিখবে এবং ভবিষ্যতে নিজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়ে উঠবে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার এই সম্প্রসারণ শুধু হিসাব বা আমানত বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি দায়িত্বশীল ও সঞ্চয়মুখী সমাজ গঠনের ভিত্তিও তৈরি করছে।

