ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০১:৩৪ এএম

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়ে দেশে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিশ্রেণির ব্যাংক হিসাব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় এমন হিসাবের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬২৯ থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৬৪৫-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ, দেড় বছরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৭ হাজার ১৬টি কোটি টাকার হিসাব, যা প্রায় ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যক্তিশ্রেণির কোটি টাকার হিসাবগুলোতে মোট আমানত ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোটি টাকার বেশি থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ সময় দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রবৃদ্ধির চেয়েও মাল্টিমিলিয়নিয়ার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেশি হারে বেড়েছে। দেশে কোটি বা তার বেশি টাকার মোট ব্যাংক হিসাবের এক-পঞ্চমাংশই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানুষ ঘরে থাকা নগদ টাকা ব্যাংকে জমা করেছেন এমন ধারণাকে অবশ্য তথ্য সমর্থন করে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোর বাইরে তথা মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে ব্যাংকের বাইরে থাকা এই নগদ অর্থের পরিমাণ কমেনি। উল্টো এই সময়ে জনগণের হাতে থাকা নোটের স্থিতি বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

প্রতি ত্রৈমাসিকে ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই প্রতিবেদনে দেশের সব কটি ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে হিসাবের সংখ্যা, আমানত ও ঋণের বিভিন্ন শ্রেণি ও ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। চলতি বছরের মার্চ সংখ্যা গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তিশ্রেণির ৩৩ হাজার ৬২৯টি হিসাবে ১ কোটি বা তার চেয়ে বেশি টাকা জমা ছিল। কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবগুলোতে জমাকৃত আমানতের স্থিতি ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

দেড় বছর পর চলতি বছরের মার্চে এসে ব্যাংকে ব্যক্তিশ্রেণির ৪০ হাজার ৬৪৫টি কোটি টাকার বেশি বা মাল্টিমিলিয়নিয়ার ব্যাংক হিসাবে আমানত স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।

একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, দেশের ধনিকশ্রেণির গ্রাহকেরা এক ব্যাংক হিসাবে কখনো কোটি টাকার আমানত জমা রাখেন না। কোটিপতিরা ৫-১০ লাখ টাকা করে বিভিন্ন ব্যাংকে বহু মেয়াদি আমানত হিসাবে অর্থ জমা করেন। আর আমানত হিসাবে টাকা ব্যাংকে না রেখে তারা জমি বা বাড়ি কেনার পাশাপাশি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেন। আবার ধনিক শ্রেণির একটি অংশ উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে দেন। পাচারকৃত অর্থে বিলাসী জীবনযাপনের পাশাপাশি বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনেন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্সসহ হয়রানির ভয়েও অতিধনীরা ব্যাংক এড়িয়ে চলেন। এ পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়ার অর্থ হচ্ছে, এই কোটিপতিদের বড় অংশই নতুন অর্থের মালিক। তারা হঠাৎ অল্প সময়ে এই অর্থ হস্তগত করেছেন এবং সেটাই দ্রুত ব্যাংকে জমা রেখেছেন।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের ১৬টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। আরও অন্তত এক ডজন ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। চেয়ারম্যান ও এমডি পদে পরিবর্তন আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও। এই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও ইতিহাসের সর্বনি¤েœ (৫ শতাংশের নিচে) নেমে আসে। ব্যবসায়ীদের ঋণ না দিয়ে ব্যাংকগুলো কেবল সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়ে। হঠাৎ করে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা কোনো শ্রেণির সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের টাকা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দেড় দশক পর দেশে ক্ষমতাসীন দল ও ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিবর্তন এসেছিল। তখন একেবারে নতুন কিছু মানুষ ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। তাদের অনেকে এখন ব্যবসা-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছেন। ব্যাংকে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে এ ঘটনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। ব্যাংকগুলোকে কঠোর পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। কোনো ব্যাংকে সামান্যতম অনিয়ম ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি শ্রেণির কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে কালোটাকার প্রভাব থাকলে সেটিও চিহ্নিত করা হবে।’