ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিএসএফআইসির ঋণ বকেয়া

মূলধন ঘাটতির ঝুঁঁকিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক

হাসান আরিফ
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৪:৩৩ এএম

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এবং এর অধীন চিনিকলগুলোর বিপুল অঙ্কের ঋণ বকেয়ার কারণে মারাত্মক আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক চাপে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধিত থাকা এই ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় বন্ড ইস্যু, পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ অথবা নতুন করে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে সোনালী ব্যাংক।

সোনালী ব্যাংক পিএলসি সূত্রে জানা গেছে, বিএসএফআইসি ও এর আওতাধীন নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া ঋণের বিপরীতে সুদসহ ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এসব ঋণের একটি বড় অংশের বিপরীতে অতীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি থাকলেও সেই গ্যারান্টির মেয়াদ এরইমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, যা ব্যাংকের জন্য নতুন করে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পুরোনো গ্যারান্টি বাড়ানো হলেও মূল সংকট থেকেই গেছে : অর্থ বিভাগের নগদ ও দায় ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্রে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকের সম্পূর্ণ বকেয়ার বিপরীতে কোনো স্থায়ী সমাধান না দিয়ে কেবল অতীতে ইস্যু করা ১ হাজার ৭৩ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে এই গ্যারান্টির মেয়াদও বর্তমানে কার্যত উত্তীর্ণ বলে দাবি করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে পুরো বকেয়ার তুলনায় এই সীমিত গ্যারান্টি ব্যাংকের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব, সুদ মওকুফের আবেদন : সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছে, বিএসএফআইসি ও এর অধীন চিনিকলগুলোর নামে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত সুদসহ মোট পাওনার হিসাব করতে হবে। এরপর সুদ মওকুফের মাধ্যমে আদায়যোগ্য অর্থের সমপরিমাণ সরকারি বন্ড ইস্যু করা প্রয়োজন। তাহলে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে একদিকে প্রভিশন ঘাটতি হ্রাস পাবে, অন্যদিকে মূলধন ঘাটতি দূর করতে সহায়ক হবে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হলেও সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত : এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা) এর সভাপতিত্বে গত ১৩ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসএফআইসি এবং সোনালী ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঋণ বকেয়া, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি, বন্ড ইস্যু এবং ব্যাংক খাতের ঝুঁঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই সভা থেকে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ সোনালী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে পায়নি।

বিপুল অঙ্কের দায়, দীর্ঘদিনের সংকট : ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বিএসএফআইসি ও এর অধীন চিনিকলগুলো বহু বছর ধরেই লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেশি, চিনি বিক্রির দাম কম, মিলগুলোর যন্ত্রপাতি পুরোনো এবং ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার কারণে এসব মিল নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে সোনালী ব্যাংকের কাছে তাদের বকেয়া ঋণের অঙ্ক বছর বছর বেড়েই চলেছে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে সুদসহ মোট পাওনা ছিল ৬ হাজার ৯২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে একাংশ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দ্বারা আচ্ছাদিত হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো গ্যারান্টির আওতায় নেই।

অশ্রেণিকৃত রাখা হলেও বাড়ছে প্রভিশনের চাপ : রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসএফআইসির প্রতি দেওয়া ঋণগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ঋণ তথ্যভা-ারে (সিআইবি) এখনো অশ্রেণিকৃত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে ঋণ হিসাবগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিপুল অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে সোনালী ব্যাংককে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা অর্জন করলেও বিএসএফআইসি সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার কারণে সেই মুনাফার বড় অংশ আটকে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মূলধনী শক্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্যারান্টি মেয়াদ শেষ, ঝুঁকি আরও বাড়ছে : আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলোÑ ঋণগুলোর বিপরীতে থাকা রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ এরইমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। গ্যারান্টি নবায়ন বা নতুন গ্যারান্টি না এলে ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে, যা ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।

সরকারের সহযোগিতা কামনা : এ পরিস্থিতিতে সোনালী ব্যাংক পিএলসি আবারও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছেÑ বিএসএফআইসি ও এর অধীন চিনিকলগুলোর নামে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে সরকারি বন্ড ইস্যু, সম্পূর্ণ বকেয়া এককালীন পরিশোধ অথবা নতুন রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া হোক। ব্যাংকটির মতে, এসব ব্যবস্থার যেকোনো একটি বাস্তবায়ন করা না হলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যাবে, যা সামগ্রিক ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের লোকসানি কাঠামো এবং সরকারি গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত না এলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় আকার নিতে পারে।