× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রহিম শেখ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০২:০৮ এএম

কোটিপতিদের টাকা ভোটের মাঠে!

রহিম শেখ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০২:০৮ এএম

রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের আমানতকারী কমেছিল। সে সময় কোটি টাকা বা তার বেশি জমা রয়েছে- এমন ব্যাংক হিসাব কমেছিল। অস্থির সেই সময়ের পর কোটি টাকার বড় আমানতকারীরা তাদের অর্থ নিয়ে আবারও ফিরছিলেন ব্যাংকে। বাড়ছিল তাদের আমানতের পরিমাণ কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, আবারও ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিতে শুরু করেছেন দেশের ধনীরা। মাত্র ৯২ দিনের মধ্যে তারা ব্যাংক থেকে তুলেছেন প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে কোথায় গেল এত পরিমাণ টাকা? বিশেষ করে দেশে যখন বিনিয়োগ স্থবির, আবার অর্থ পাচারেরও সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ। তাহলে কোটিপতিরা এত টাকা তুলে কী করছেন? আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন নির্বাচনি লেনদেনে ব্যয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ অর্থ। মোটাদাগে টাকা উড়ছে নির্বাচনের মাঠে!

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘শিডিউলড ব্যাংক স্ট্যাটিসটিকস’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের জুন শেষে কোটি টাকার হিসাবে জমার পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর মাসের শেষে এসব হিসাবে জমার পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৮ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্টে জমা কমেছে ৫৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত কোটিপতি ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবের হালনাগাদ তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অনুমান করা যায় নির্বাচন যেহেতু ঘনিয়ে আসছে তাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক হিসাব থেকে বেরিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন, ২০২৫ প্রান্তিকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬। আর সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৭৩৪। গত বছরের মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় জুন প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে কোটিপতি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছিল পাঁচ হাজার ৯৭৪। আর জুন প্রান্তিকের তুলনায় সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ৭৩৪। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক সরকারের অভাবের মাঝেও দেশে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কিন্তু কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানও। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার একাধিক কোটি টাকার হিসাব যেমন রয়েছে তেমনি ব্যক্তি পর্যায়েও রয়েছে একাধিক কোটি টাকার হিসাব। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে কেউ কেউ টাকা তুলে বাড়ির সিন্দুকে রাখতে পারেন বলেও ধারণা করছেন কোনো কোনো ব্যাংকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘খেয়াল করলে দেখবেন বড় অঙ্কের সম্পদধারীরা বরাবরই রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশের বিষয়ে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়েও ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানোর ট্রেন্ড দেখা গিয়েছিল। পরিবেশ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গেলে তাদের মধ্যে নিরাপদ স্থানে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়ে যায়।’ ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাব কমার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি বলেই মনে করছেন এই ব্যাংকার।

২০২৪-এর জুলাই-সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবে মোট জমা ছিল ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর ঠিক আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ ২০২৪-এর এপ্রিল-জুন সময়ে জমা ছিল ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক সময়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্টগুলোতে আমানতের পরিমাণ কমেছিল ২৬,১৮৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউ অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এমন প্রবণতা থেকে ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বড় আমানতকারীরা বেশি সতর্ক হয়ে পড়েন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকে যারা টাকা রেখেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকের ভিত্তি বিবেচনায় বড় অঙ্কের আমানত একটিমাত্র হিসাবে রাখাটাও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্ককে ছোট ছোট হিসাবে ভাগসহ অন্য খাতে স্থানান্তরের প্রবণতাও ঘটে থাকতে পারে। সেই সময়ে অবশ্য কমেছিল কোটি টাকা বা তার বেশি আমানতকারী ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও। তখন এ ধরনের অ্যাকাউন্ট কমেছিল ১,৬৫৮টি।’

অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা রয়েছে। এ কারণে দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে কিছু অর্থ সরে থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে পুরো অর্থই এক ব্যাংক থেকে সরে আরেক ব্যাংকে যাবে। আরেকটা অর্থনৈতিক কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ থাকায় খরচ বেড়েছে। তবে এটা বড় কোটিপতিদের আমানতে প্রভাব ফেলার কথা নয়।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে কিন্তু বিনিয়োগ বাড়েনি। আবার টাকা পাচারের কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি। সেক্ষেত্রে একটা হতে পারে ছোট কোটিপতি তাদের জীবনযাপনের মান ধরে রাখতে হয়তো হিমশিম খাচ্ছে। তারা নিজেদের সঞ্চয়ে হয়তো হাত দিচ্ছেন। হতে পারে মাঝারি ব্যবসায়ীদের অনেকেরই হয়তো আগের মতো উপার্জন নেই। কিন্তু তার জীবন মান তো ধরে রাখতে হচ্ছে।’

সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনে টাকার প্রবাহ আগেও ছিল এখনো আছে। তবে অন্য সময়ে আমরা দেখেছি নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে গেছে। এবার তেমনটা হতে পারে বলে আমার ধারণা।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন। ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতিদের হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭ এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯৭৬টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে এবং সবশেষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি ছিল। এখন এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজারে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সব ধরনের অ্যাকাউন্ট মিলে বেড়েছে আমানত এবং হিসাবের সংখ্যা। সেপ্টেম্বর শেষে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৩১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। যা চলতি বছরের জুন শেষে ছিল ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৩৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯০ লাখ দুই হাজার ৬৭১। যা সেপ্টেম্বরের সবশেষ হিসাব অনুযায়ী ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০। সেই হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতের মোট হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯।

প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে হবে গণভোটও। তার আগে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারের পথরেখা বেঁধে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী এখন চলছে আপিল নিষ্পতির কার্যক্রম। চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি, নির্বাচনি প্রচার চলবে ২২ জানুয়ারি থেকে ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!