ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যুদ্ধের শঙ্কায় ফাঁকা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ

মো. সায়েম ফারুকী
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০৬:৪৩ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নেমে এসেছে অদৃশ্য আতঙ্ক। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের শঙ্কায় একের পর এক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের আকাশপথ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইট বাতিল, রুট পরিবর্তন ও আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো যাত্রী। ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বহর মোতায়েনের পাল্টা হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লাইভ-ফায়ার মহড়া ও আকাশসীমা সীমিত করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ফলে ফাঁকা হয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। এদিকে এখনো শুরু না হলেও বৈশি^ক বিমান চলাচল ও জ¦ালানি বাজারে ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে বিমান চলাচলে আগের তুলনায় নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। একের পর এক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল বা বিকল্প রুটে পরিচালনার ঘোষণা দিচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ ইরান ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা। এর মধ্যেই ইরানের আকাশসীমা ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) সতর্কতা জারির পর পরিস্থিতি আরও দ্রুত বদলে যায়। ইএএসএর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার ঘোষণায় এয়ারলাইনসগুলো আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়া ও ইউরোপীয় সংস্থার সিদ্ধান্ত : ভারতের বৃহৎ বেসরকারি বিমান সংস্থা ইন্ডিগো জানায়, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে দিল্লি ও মুম্বাই থেকে তিবিলিসি, আলমাটি, তাসখন্দ ও বাকু রুটের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত গতকাল বুধবার পর্যন্ত কার্যকর থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়। এয়ার ইন্ডিয়াও ইউরোপ ও আমেরিকাগামী ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিকল্প হিসেবে ইরাক ও অন্যান্য নিরাপদ আকাশপথ ব্যবহার করা হচ্ছে, যদিও এতে ফ্লাইটের সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে। ইউরোপের বড় এয়ারলাইনসগুলোরও একই চিত্র। কেএলএম, লুফথানসা ও এয়ার ফ্রান্স এয়ারলাইনস দুবাই, রিয়াদ ও তেল আবিবসহ একাধিক গন্তব্যে ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। কেউ কেউ অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তনে সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ওপর। অনেককে শেষ মুহূর্তে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করতে হচ্ছে, কেউ কেউ দীর্ঘ রুটে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। এয়ারলাইনসগুলো যাত্রীদের নিয়মিত ফ্লাইট স্ট্যাটাস যাচাই ও বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে বলছে। তবে বাস্তবে এই অনিশ্চয়তা যাত্রীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক হামলার ঘোষণাও আসেনি। কিন্তু বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হলো ‘যুদ্ধ শুরুর আগের মুহূর্ত’। ভুল শনাক্তকরণ, ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার স্মৃতি এখনো অ্যাভিয়েশন জগৎকে তাড়া করে বেড়ায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এয়ারলাইনসগুলো এখন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি : বিশ্ব জ¦ালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি এখন উত্তেজনার কেন্দ্রে। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এমন এক জায়গায় ইরান তিন দিনের লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জারি করা নোটিশ টু এয়ারম্যানে  (নোটাম) জানানো হয়, প্রণালির আশপাশে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত আকাশসীমা সাময়িকভাবে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হবে। নির্ধারিত এলাকায় বেসামরিক ও সামরিক উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি শুধু একটি সামরিক মহড়া নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া একটি কৌশলগত বার্তা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টপাল্টি সামরিক অবস্থানে শুধু যাত্রী চলাচলই নয়, প্রভাব পড়েছে বৈশি^ক জ¦ালানির বাজারে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক মহড়ার প্রভাবে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতার আভাস মিলছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ¦ালানির দামের ঊর্ধ্বগতি বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে, যার প্রভাব পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর আরও বেশি।

সামরিক বহর মোতায়েন করে মার্কিন চাপ : ইরানের মহড়া ঘোষণার আগেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সহায়ক যুদ্ধজাহাজের বহর। একই সঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এসব মোতায়েনের উদ্দেশ্য ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও প্রস্তুতি’। তবে বাস্তবে এটি ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে মোকাবিলায় ‘সব বিকল্প টেবিলে রয়েছে’। এই বক্তব্যই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের এই সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই সরাসরি কোনো পক্ষ নিতে চাইছে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় নিজেদের আকাশসীমা বা ভূখ- ব্যবহার করতে দেবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর সমুদ্রপথে অবস্থান করায় ওয়াশিংটনের বিকল্প পথ এখনো খোলা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই ভারসাম্য যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।

ইরানে হামলার আশঙ্কা শুধু একটি সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি এখন বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল, জ¦ালানি বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক সেই আতঙ্কেরই বাস্তব প্রতিফলন।