ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

ভোট পাহারায় দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা 

শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ০৪:১৭ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সহিংসতা ঠেকাতে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। যেকোনো ধরনের নাশকতা রুখে দিতে নেওয়া হয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। দেশব্যাপী মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের। মাঠে অন্য সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, কোস্ট গার্ড, র‌্যাবসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সব ইউনিট। আছেন সব কয়টি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও। তথ্য অনুসারে, সব মিলিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন সদস্য এখন মাঠে রয়েছেন। তারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র ও ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটারের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। এর বাইরে থাকছে বিএনসিসি ক্যাডেট ও গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার)।

ভোট ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ও ঝুঁঁকিপূর্ণ প্রায় ২৫ হাজার ভোটকেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করে চলবে নজরদারি। পুলিশের বিশেষায়িত বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট, সোয়াত, কে-৯ ইউনিট এবং ক্রাইম সিন ভ্যান মাঠে মোতায়েন থাকবে। নির্বাচনে কোনো ভোটকেন্দ্রে মব সহিংসতা হলেই ভোট বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। নির্বাচনে কোনো জঙ্গি হামলার শঙ্কা দেখছে না র‌্যাব, তবুও সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী সরকারের আমলে বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এবার নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা বাড়তে পারে। এসব ঘটনা রোধে ইসির শক্ত অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ এ ধরনের পরিবেশ পায়নি। এ কারণে মানুষের মধ্যে সহিংসতার পরিবর্তে নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আকাক্সক্ষা বেশি। তবে শঙ্কার বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন বলা হলেও সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় বেড়েছে শঙ্কা। এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বেশ কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী ও মনোনীত প্রার্থী এবং জামায়াত প্রার্থীর অনুসারীদের ঘিরে উত্তেজনা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। 

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন সদস্য। এ ছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র‌্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার-ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর বাইরে ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি মাঠে থাকবেন।

ঢাকার ১৪০০ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি

ঢাকা মহানগরীর ১৩টি সংসদীয় আসনের বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে ঢাকা মহানগরীর ১ হাজার ৪০০টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা এবং দায়িত্বরতদের শরীরে বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে। পুরো নির্বাচনি এলাকায় ৮০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোট গণনা কেন্দ্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এড়াতে জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে ফলাফল ঘোষণার চেষ্টা করা হবে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশে কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তার ঝুঁকি নেই এবং কেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে।

থাকছে সোয়াত, কে-৯ ও বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট

ঢাকায় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশের বিশেষায়িত বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট, সোয়াত, কে-৯ ইউনিট এবং ক্রাইম সিন ভ্যান মাঠে মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকায় চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই, তবুও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। আশা করছি, সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, নির্বাচনের বিভিন্ন দায়িত্বে ঢাকায় ডিএমপির মোট ২৬ হাজার ৫১৫ জন সদস্য মোতায়েন আছে। ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ছাড়াও বাইরে স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্সের পাশাপাশি বিশেষায়িত বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট, সোয়াত, কে-৯ (ডগ স্কোয়াড) ইউনিট এবং ক্রাইম সিন ভ্যান সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।

গতকাল শেরেবাংলানগরে রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে র‌্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, নির্বাচনে কোনো জঙ্গি হামলার শঙ্কা দেখছে না র‌্যাব, তবুও সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে। ঝুঁকি তাদেরই আছে, যারা নির্বাচন ব্যাহত করবে, জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করবে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বড় ধরনের কোনো গোলযোগ ছাড়াই সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে জানিয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, নির্বাচনের ফলাফল না মেনে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি এবং আনসারসহ সবার অংশগ্রহণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সংখ্যায় নির্বাচনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী হচ্ছে আনসার, তাদের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ।

তিনি বলেন, কোনো কেন্দ্রে মব সহিংসতা হলেই ভোট বন্ধ করা হবে। ভোট ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তায় কাজ করছেন মোট ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ২৫ হাজার ভোটকেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করা হবে বলেও জানান আইজিপি। তিনি বলেন, এবার ভোটের আয়োজনকে আস্থা ফেরানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে পুলিশ। ভোটকে কেন্দ্র করে যেকোনো মব সহিংসতার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, এখন পর্যন্ত যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে, তাতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরো দেশেই এটা বিস্তৃত থাকবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওভারল্যাপ থাকবে। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

ভোটার ও প্রার্থীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সমর্থকÑ সবার প্রতি আহ্বান যে, আমরা যেন এই সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখি। যেসব জায়গায় কিছুটা হলেও এখন পর্যন্ত টেনশন বিরাজমান, সেগুলো যেন আর কন্টিনিউ না করে। সুন্দর সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে, উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের অতিপ্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করি।