ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ। ভূমিধস জয়ে দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার আকার কেমন হবে এবং কারা পাচ্ছেন মন্ত্রিত্ব? রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- সেটাও জনগণের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপি সূত্রে জানা যায়, নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে দলে আলাপ-আলোচনা চলছে। শিগগিরই জানা যাবে মন্ত্রিসভার আকার এবং কারা মন্ত্রী হচ্ছেন- সে সব তথ্য। তবে এ নিয়ে দলের মেগা ও চমকপ্রদ পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি সূত্র।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এবার ভোট হওয়া ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এর মধ্যে বিএনপির একক আসন ২০৯টি। অন্যদিকে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
বিএনপি বলছে, গণতন্ত্রের মহাসড়কে উঠছে বাংলাদেশ। বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারা। এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিএনপি সরকার গঠন করতে প্রস্তুত। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান জানান, ভোটের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের জন্য জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। অবশ্য এর আগে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছিলেন, আগামী ১৫ কিংবা ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে পারে নতুন সরকারের শপথ। এরপর গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের দিন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, আগামী ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি শপথ নিতে পারে নতুন সরকার। এর একদিন পর গতকাল শুক্রবার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ১৮ ফেব্রুয়ারি শপথ নেবে নতুন সরকার।
নিরঙ্কুশ বিজয় তো অর্জিত হলো, এবার বিএনপির সরকার গঠন ও মন্ত্রিপরিষদে কারা থাকছেন? এই আলোচনাই এখন সবার মুখে মুখে। বিএনপির বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, দলের মহাসচিবকে নিয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। তাকে রাষ্ট্রপতিও করা হতে পারে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আরেক যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়া হতে পারে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ মন্ত্রণালয়, রেজা কিবরিয়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, রুহুল কবির রিজভী টেকনোক্র্যাট কোটায় তথ্য মন্ত্রণালয় এবং আমিনুল হককে টেকনোক্র্যাট কোটায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। শিগগির জানা যাবে মন্ত্রিপরিষদের আকার এবং কে কোন মন্ত্রণালয় পাচ্ছেন।
বিএনপি নেতারা বলছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস গড়লেন তারেক রহমান। নির্বাসনের দেয়াল ভেঙে দেশে ফিরেই জয় করলেন মানুষের মন। মায়ের দেখানো পথে প্রথমবারের মতো দুই আসনে নির্বাচন করে পেলেন জয়। মা সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী। গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রী। আর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করে তিনি কুড়িয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা।
ফল প্রকাশের পর অপেক্ষা এখন সরকারি গেজেট প্রকাশের। ১৫ কিংবা ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে পারে নতুন সরকারের শপথ। সরকার গঠন হলে রমজানের শুরুতেই মন্ত্রিপরিষদ গঠন করবে বিএনপি।
গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকেই গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আসতে থাকেন বিএনপির বিজয়ী সংসদ সদস্যরা। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কক্সবাজার থেকে ফিরেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। রাতে গুলশান কার্যালয়ে চলে রুদ্ধদ্বার বৈঠক।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া বেসরকারি ফল অনুসারে, বিএনপি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এটাই প্রথম নির্বাচন এবং বাজিমাত। তার নেতৃত্বেই এককভাবে সরকার গঠন করতে চলেছে বিএনপি। তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির আগের ঘোষণা অনুযায়ী, তারেক রহমানই হতে চলেছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। এদিকে বিএনপির এই বিজয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে আমেরিকা, চীন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত বছর ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তারেক রহমান। এর কিছুদিন পর ৩০ ডিসেম্বর মারা যান তার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর কয়েকদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।
২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে ছিল। সেই সরকারের অন্যতম অংশীদার এবং দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই এবার নির্বাচনি লড়াই হয়েছে বিএনপির।
এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২৯৯ আসনে ভোট হলেও দুটি আসনে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেগুলোর ফল ঘোষণা স্থগিত রেখেছে কমিশন।
গত ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেনÑ এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল। সে সময় আন্দোলনরত আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো বিচারপতি কে এম হাসানকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় জটিলতা বাড়ে। একপর্যায়ে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। এরপরও রাজনৈতিক সংকট বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে তুমুল সহিংসতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ওই সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়ে পরে মুক্তি পেয়েছিলেন তখনকার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে, ২০০৭ সালের মার্চে, দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। তখন ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে যান তিনি। এরপর থেকে তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে সেখান থেকেই দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে শুরু করেন তারেক রহমান।





সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন