ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্থানীয় সরকার নির্বাচন

জয়েই মন বিএনপির, বদলা চায় জামায়াত

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬, ১২:২৮ এএম

ভূমিধস বিজয় নিয়ে গঠিত বিএনপি সরকারের মন এখন দেশ গঠনে। একের পর এক উদ্যোগ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় নতুন সরকার। রাজনীতিতে পরীক্ষিত দলটির লক্ষ্য জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আস্থা জয় করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনীতিতে সুবাতাস ফেরানো। পুরোনো প্রথা ভেঙে গড়ছে নতুন রেকর্ড। ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে যেতে চায় বিএনপি। এরই মধ্যে তার নমুনাও দেখা গেছে কিছুটা। ক্ষমতা গ্রহণের পর বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় নবাগত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি গাড়ি ব্যবহার তো করবেনই না, ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানিও নিজ অর্থে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বহরে ১৪টি গাড়ি ব্যবহারের রেওয়াজ থাকলেও তা কমিয়ে চারটি ব্যবহার করবেন বলে জানা গেছে। যদিও আগের প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেছে অর্ধশত গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে। সে সময় ট্রাফিক সিগন্যালে দীর্ঘ সময় যানজটে নাকাল হতে হতো নগরবাসীকে। কিন্তু সেই দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকার পুরোনো সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। এর কারণ, পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পাহারা না দিতে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চলাচলকালে দীর্ঘ সময় সড়ক বন্ধ করে না রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। একুশে পদক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সচিবালয় থেকে ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে হেঁটে যেতে দেখা গেছে তারেক রহমানকে। অনুষ্ঠান শেষে স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে সচিবালয়ে প্রবেশে করার ভিডিও দেখেছে বিশ^। দেশ গঠনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জয়েই মন রেখেছে বিএনপি।  

অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের ভুল শুধরে স্থানীয় নির্বাচনে বদলা নিতে মরিয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের মতো সারা দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়ের ফল ঘরে তুলতে চায় জামায়াত। যদিও বিষয়টি এত সহজ নয় বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারো কারো মতে, সব বিষয়ে বাধা হয়ে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দিতে প্রচেষ্টা ছিল জামায়াতের। আর অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু জামায়াত-এনসিপির পক্ষেই চলে গিয়েছিল তাই এটা খুব অবান্তর নয় বলেই মনে করেন তারা। জাতীয় নির্বাচন এমনিতেই অনেক বিলম্বিত হয়েছে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষকরা। নির্বাচন আরও আগে হলে বেশি ভালো হতো দেশের জন্য। অনির্বাচিত সরকার কখনোই জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসতে পারে না।

এ জন্য জামায়াত যাতে বেশি ক্ষেপে না যায় সেজন্য তাদের বাগে এনে জাতীয় নির্বাচনের জন্য পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিয়েছে। প্রায় সব কটি ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়ে প্রায় উড়ছিল ইসলামপন্থি ওই রাজনৈতিক দলটি। যদিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের ডিজাইন সব বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুললেও কোনটিতেই পাত্তা দেয়নি বিএনপি। বিএনপির সেই শক্ত বাঁধ ভেঙে দাবিও আর আদায় করা হয়নি জামায়াতের। ফলে জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে প্রতিশোধ নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।

বর্তমানে দেশের একমাত্র মেয়র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে রয়েছে। সেখানকার মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং নগরবাসীর সেবা প্রদান চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।’ তবে মেয়র হলেও তার কাউন্সিলর নেই। ফলে ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দারের ভূমিকায় তিনি। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত নির্বাচন হবে ততই মঙ্গল হবে নগরবাসীর।’

বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহ। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সরকারের উদ্যোগগুলো স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন খুবই জরুরি। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, খাল খনন তদারকি কারা করবে? এমপি, মন্ত্রী, প্রশাসক? এসব কাজ সুন্দরভাবে করতে হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন খুবই জরুরি। নির্বাচনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া আছে। আশা করি সরকার দ্রুতই নির্বাচন দেবে।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান রনি। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমাদের আশা ঈদের পর নির্বাচনের তপশিল দেবে কমিশন। তবে নতুন প্রশাসক নিয়োগ হওয়ায় নির্বাচন পেছানোর শঙ্কাও আছে। নির্বাচন দ্রুত হলে মেয়র, কাউন্সিলর সব পাবে এলাকার মানুষ। পুরোনো সেটআপ না থাকলে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মশার যে উৎপাত বেড়েছে তা ঠেকানোর উদ্যোগ নেই। কারণ মেয়র নেই, কাউন্সিলর নেই। কাজটা করবে কে?’

স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টি স্পষ্ট না করলেও রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকার সঠিক সময়ে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। প্রশাসক নিয়োগ দেওয়াতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বেশ কিছু সরকারি নিয়ম-কানুন ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার বিষয় রয়েছে। সব হিসাব এক জায়গায় নিয়ে এসে সরকারের তরফ থেকে সঠিক সময়ে আমরা এই নির্বাচনগুলোর ব্যবস্থা করব। তবে নিঃসন্দেহে এই নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনের পর জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড-কৃষি কার্ড নিয়ে পুরোদমে কাজ করছে। স্থানীয় সরকারের বিষয়টি নিয়েও কাজ করছে সরকার। প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়ে গেছে পতিত স্বৈরাচার। আপাতত মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকার দুটি সহ সারা দেশে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। যথাসময়ে নির্বাচনও হবে।’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য জামায়াত প্রার্থী চূড়ান্ত করে রেখেছে জাতীয় নির্বাচনের আগেই। নির্বাচনি তপশিল ঘোষণার পর পুরোদমে কাজ শুরু করবে তারা। তবে এখনো মাঠে তারা কাজ করছে নিয়মের মধ্যে থেকেই। মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে সামর্থ্য অনুযায়ী।’ জাতীয় নির্বাচনের ত্রুটি চিহ্নিত করে জামায়াত কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো ফল করবে জামায়াত।’

নির্বাচন বিশ্লেষক আবদুল আলীম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের কিছু নির্বাচনি কৌশল কাজ করে। সেটিকে কেউ কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং বলে থাকে। বিএনপি চাইবে জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের দলের প্রার্থীদের বিজয় হোক। এটা সত্য, যারা সরকারে থাকে তাদের প্রার্থীরাই বেশি বিজয়ী হয়। তাতে করে সেসব এলাকায় উন্নয়ন বেশি হয়। আর জামায়াত বিরোধী দলে থাকলেও তারা চাইবে নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বেশি বিজয়ী হোক। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের যে ভরাডুবি হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা তার বদলা দিতে চাইবে, সেটাই খুব স্বাভাবিক। তারা বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে তো বিজয়ী হয়ে দেখিয়েছে। জামায়াতের ভোট তো অতীতের চেয়ে অনেক বেড়েছে, জাতীয় নির্বাচনে সেটি তো প্রমাণ করে দিয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও যদি জাতীয় নির্বাচনের মতো প্রভাবমুক্ত হয় তবে তো উদাহরণ হয়ে থাকবে।’