শনিবার মধ্যরাত থেকে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতজুড়ে বিরাজ করেছে চরম উত্তেজনা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েলের হঠাৎ সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে আমিরাত সর্বোচ্চ সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জোরদার করেছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। এ সময়ে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিশ্বখ্যাত স্থাপনাগুলোকে ঘিরে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় একদিকে যেমন হতাহত ও যাত্রী দুর্ভোগের খবর এসেছে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাল্টা সক্ষমতার চিত্রও উঠে এসেছে। নিহত হয়েছেন দুজন বেসামরিক নাগরিক। আহত ১৫ জন। এসব খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো।
ইরানি ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী আবুধাবি। আবুধাবি জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ইরানের ড্রোন হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আরও সাতজন আহত হয়েছেন বলে দেশটির শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়েছে।
এর আগে স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১২টা নাগাদ হামলা চালানো হয় দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। সব এয়ারপোর্ট ও এভিয়েশন স্টাফ এবং পাইলট-ক্রুদের এয়ারপোর্ট থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। দ্রুত অবকাঠামোগত এই সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে জানানো হয়েছে।
সিরিয়াম নামের একটি বিশ্লেষণ সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে গতকাল রোববার থেকে গালফ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৭০০-এর বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোট ৪ হাজার ৩২৯টি নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে ৭১৬টি ফ্লাইট গতকাল সরকারিভাবে বাতিল করা হয়। এতে ২০ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। এয়ারপোর্ট ও এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাদের পুনরায় বুকিং, অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা, খাবার ও পানীয় সরবরাহ করছে। যাত্রীদের সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে অফিসিয়াল আপডেট দেখার এবং সরাসরি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেনারেল সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি জানিয়েছে, ড্রোন, গ্লাইডার এবং অ্যামেচার প্লেন উড়ানোর অনুমতি এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হচ্ছে, যাতে নিরাপত্তা বাড়ানো যায় এবং দেশের আকাশসীমা রক্ষা করা যায়।
শনিবার মধ্যরাতে জাবেল আলী পোর্টের একটি জেটিতে আগুন লাগে, যা আকাশে ধ্বংসকৃত ড্রোনের অংশবিশেষ থেকে সৃষ্ট বলে জানা যায়। তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ব্যবস্থা নিয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি।
এ ছাড়া শনিবার বিকেলে ডাউনটাউনে বুর্জ খলিফার পার্শ্ববর্তী একটি জায়গায় ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনার পর রাতে বুর্জ আল আরাব হোটেলের ওপর দিয়ে আসা একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। এর ধ্বংসাবশেষের কারণে সামান্য আগুন লেগেছিল, যা সিভিল ডিফেন্স দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি। এর আগে পাম জুমেইরাহতে ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলে মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন চারজন।
মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স জানিয়েছে, বিমানবাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানি হামলার শুরু থেকে ১৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন নষ্ট করেছে। এটি তাদের উচ্চ প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা নিশ্চিত করে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরব আমিরাতে বসবাসকারীদের মোবাইলে রাতে বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতি বাড়াতে এবং ঝুঁকি কমাতে এটা পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা বলে জানানো হয়।
এমন পরিস্থিতিতেও আমিরাতের কোথাও খাদ্যসংকট নেই বলে জানা গেছে। বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতারা জানান, চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা ও আকাশপথ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও তাদের পর্যাপ্ত সরবরাহ মজুত আছে। তবে অনলাইন অর্ডার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সুইচ টু ডিসট্যান্স লার্নিং পদ্ধতিতে দুবাইয়ের সব বেসরকারি স্কুল ৪ মার্চ পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস নেবে। নলেজ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ১ থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনের জন্য রিমোট ওয়ার্ক চালুর সুপারিশ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় কর্মীদের খোলা বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
আমিরাতে ইরানি হামলায় বাংলাদেশিসহ নিহত ৩ : সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। হামলায় আরও একজন পাকিস্তানি ও একজন নেপালি নাগরিক নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান হামলা চালালে আমিরাতে অন্তত ৩ জন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি ও একজন নেপালি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
মন্ত্রণালয় বলছে, আমিরাত ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে যার মধ্যে ১৫২টি ধ্বংস করা হয়েছে এবং দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মোট ৫৪১টি ইরানি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০৬টি প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।

