× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: মার্চ ১৯, ২০২৬, ০৫:৫৪ এএম

কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে জার্মানিতে

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: মার্চ ১৯, ২০২৬, ০৫:৫৪ এএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ (গ্রাফিক্স)

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ (গ্রাফিক্স)

সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের জার্মানি সফরকালীন বিশেষায়িত যানবাহন ভাড়া ইস্যুতে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে বাংলাদেশকে। জার্মানির একটি আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির একটি প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের এই জরিমানা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দেশটির রাজধানী বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কতিপয় কর্মকর্তার গাফিলতিতে সৃষ্ট এই অর্থদণ্ডে তৈরি হয়েছে কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিও। এদিকে বার্লিনে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নাইনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আর্থিক বিতর্ক। সহধর্মিণী ও দুই সন্তান সঙ্গে না থাকলেও, তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা তুলেছেন রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন।

এ ছাড়া জার্মানিতে বিভিন্ন শহরে ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭ লাখ টাকারও বেশি যাতায়াত ভাতা তুলেছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কারণেও ভ্রমণ করেছেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা।

২০২২ সালের ১২ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত জার্মানি সফরের কথা ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের। রাষ্ট্রপতিসহ তার বহরের যাতায়াতের জন্য বার্লিনের ‘এসএটি জিএমবিএইচ সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের’ সঙ্গে চুক্তি করে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস। ১২ দিনের জন্য ২৩টি গাড়ি ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সে বছরের ১০ অক্টোবর ১ লাখ ৯২ হাজার ৩২৭ ইউরো তথা ১ কোটি ৬১ লাখ ৬২০ টাকা মূল্যের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

তবে সেই চুক্তিতে কোনো ‘এক্সিট রুট’ বা ‘ক্যান্সেশন ক্লজ’ ছিল না। অর্থাৎ, একবার চুক্তি স্বাক্ষরের পর সেটি বাতিলের কোনো সুযোগ না রেখেই চুক্তিতে আবদ্ধ হয় দূতাবাসের তৎকালীন প্রশাসন। সে সময় বার্লিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন আওয়ামী লীগের খুবই ঘনিষ্ঠ আমলা মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

পরবর্তীতে আবদুল হামিদের ভ্রমণসূচির পরিবর্তন হলে এসএটি সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট থেকে আর গাড়ি নেয়নি বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস। অবশ্য আবদুল হামিদের ভ্রমণকালে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘বিজি ট্যাক্সি আইটি সার্ভিস জিএমএইচ’ থেকে গাড়ি নেওয়া হয়। সে সময় অতিরিক্ত ২ কোটি ২৭ লাখ ৩৮২ টাকা খরচ হয়। এদিকে চুক্তি অনুযায়ী, নিজেদের ১ লাখ ৯২ হাজার ৩২৭ ইউরো উদ্ধারে এসএটি বাংলাদেশকে বিবাদী করে জার্মানির নিম্ন আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০২৩ সালে দায়েরকৃত এই মামলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়নি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগও কাজে লাগানো হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত মামলায় আপিল করার সুযোগও হাতছাড়া করে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস।

মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী পিটার কোটেকের টাইমশিট দেখায় যে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই মামলাটি সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। আদালতের আদেশ পড়া, জবাব প্রস্তুত, নথি পর্যালোচনা, শুনানির প্রস্তুতি, ফোনকল, ইমেইল- সবই চলছিল নিয়মিতভাবে। একপর্যায়ে দেশটির নিম্ন আদালত বাংলাদেশের বিপক্ষে রায় দেয়। সেই রায়ে এসএটিকে ৮৮ হাজার ১১২ ইউরো, প্রতিষ্ঠানটির প্রি-লিটিগেশন ও আইনজীবীর খরচ ২ হাজার ৪২২ ইউরো এবং আদালতের একটি খরচ বাবদ ৩৩১ ইউরো পরিশোধ করতে বলা হয় বাংলাদেশকে। এর সঙ্গে যোগ হবে প্রযোজ্য সুদ।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাস নিয়োজিত আইনজীবীর খরচ ৮ হাজার ১১০ ইউরোসহ গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক হিসাবে বাংলাদেশের খরচের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৭২০ ইউরো তথা ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এখনো এই অর্থ পরিশোধ করেনি বাংলাদেশ। ফলে অদ্যবধি এই অঙ্ক বেড়ে আরও বেশি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, হেড অব চ্যান্সেলর তানভির কবীরের গাফিলতিতে এই অর্থ খরচ হচ্ছে বাংলাদেশের। আপিলের প্রক্রিয়ায় না গিয়ে জরিমানা প্রদানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থ ছাড়ের আবেদন করেছেন তিনি।

তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এ চুক্তি হয়েছে। তৃতীয় একজন আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী, চুক্তিপত্রে চুক্তি বাতিলের কোনো সুযোগ না থাকায় উচ্চ আদালতে আপিল করেও এই মামলা হারব। তাই আপিল না করে জরিমানা পরিশোধ করাই শ্রেয়। আর এটা আমার সিদ্ধান্ত না। মন্ত্রণালয় থেকেই মৌখিকভাবে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেভাবেই কাজ করছি।

এদিকে বার্লিনে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালের মার্চে আলজেরিয়া থেকে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে যান জুলকার নাইন। বিসিএস ১৭ ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তার সঙ্গে সহধর্মিণী এবং দুই সন্তান বার্লিনে এখন পর্যন্ত যোগ দেননি। কিন্তু বৈদেশিক বদলি খরচ বাবদ তাদের জন্য ২১ হাজার ২৭২ ইউরো তুলেছেন রাষ্ট্রদূত, ১২৪ টাকা ৮৭ পয়সা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা যোগ দিলে এই ভাতা পান। রাষ্ট্রদূতের দূতাবাসে যোগদানের দিন থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিবারের সদস্যরা সেখানে যোগ দিলে তারা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বলে গণ্য হবে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো তারা বার্লিনে আসেননি। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রদূতের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।

পরিচয় গোপনের শর্তে সাবেক এক রাষ্ট্রদূত বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য যে ভাতা অগ্রিম তুলতে পারেন, তার মেয়াদ থাকে ছয় মাস। অর্থাৎ, ছয় মাসের মধ্যে তাদের স্টেশনে (যে দূতাবাসে নিয়োগ হয়েছে) আসতে হবে। যদি আসেন, তাহলে সেই খরচের হিসেব বা ভাউচার দেওয়ার জন্য আরও ছয় মাস সময় পাওয়া যায়। যদি পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রদূতের স্টেশনে না আসেন, তাহলে উত্তোলন করা ভাতা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইনের পরিবারের সদস্যরা বার্লিনে এখন পর্যন্ত আসেননি। তাদের খরচ বাবদ উত্তোলনকৃত ভাতাও ফেরাননি রাষ্ট্রদূত। উপরন্তু ২০২৫ সালের জুনে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ভাতা ২ হাজার ৯৬৮ ইউরো তথা ৩ লাখ ৯১ হাজার ২৬ টাকা উত্তোলন করেছেন জুলকার নাইন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, তৃতীয় দেশে অবস্থান করা স্বজনদের চিকিৎসায় মেডিকেল ভাতা উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের মার্চে যোগদানের পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে বার্লিন থেকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন গন্তব্যে মোট ১৪ বার সফর করেন রাষ্ট্রদূত। এসব সফরে যাতায়াত বা ভ্রমণ ভাতা বাবদ ৩৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৬ টাকা তুলেছেন তিনি। যদিও এসব সফরের অনেকগুলোই অপ্রয়োজনীয় এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যে সফর এক দিনে সম্পন্ন করা সম্ভব, তা চার বা পাঁচ দিনের সফর হিসেবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে ভাতা বাবদ অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়। একই সময়ে ফ্রাংকফুর্ট, মিউনিখসহ বিভিন্ন শহরে বাজেট-সংকটের অজুহাতে ই-পাসপোর্ট সেবা বন্ধ রাখা হয়। প্রবাসীদের সেবা ব্যাহত হলেও প্রশাসনিক সফরে কাটছাঁট হয়নি।

বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘যেসব সফর করেছি, সেগুলো প্রয়োজনীয়। জার্মানির বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বার্লিন শহরে না। বিভিন্ন দপ্তর অন্যান্য দপ্তরে ছড়ানো-ছিটানো। সেসব শহরে কাজের প্রয়োজনেই যেতে হয়েছে। অন্য অনেক রাষ্ট্রদূত এবং অনেক কর্মকর্তার তুলনায় কম সফর করেছি।’ একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের জন্য উত্তোলন করা ভাতা বৈধভাবে নেওয়ারও দাবি করেছেন তিনি।

পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন এবং হেড অব চ্যান্সেরি তানভির কবির নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পেছনে দূতাবাসের একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করেন। তারা জানান, কর্মকর্তাদের নানান অনিয়মে সম্মতি না দেওয়াতেই তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

Link copied!