ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সাগরপথে গ্রিসযাত্রা

খাবারের অভাবে মারা গেলেন ১৮ বাংলাদেশি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ১১:১৭ পিএম

লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে ভূমধ্যসাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশী ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুরের পাঁচজন ও দোয়ারাবাজারের একজন রয়েছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থেকে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

মারা যাওয়া তরুণদের মধ্যে তিনজন রয়েছেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের। তারা হলেন- তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬)। এ ছাড়া মৃতদের মধ্যে রয়েছেন রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০), জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের সালিকুর রহমানের ছেলে সুহানুর রহমান (২২)। সাহান এহিয়া সাগরে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তার ভাতিজা মো. মুক্তাদির আহমদ। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তায়েব মিয়া (২৪)। তায়েব মিয়ার স্বজনদের ধারণা, তিনিও সাগরে মারা গেছেন। কারণ, অন্যদের সঙ্গে তিনিও ছিলেন।

জগন্নাথপুর উপজেলার মারা যাওয়া যুবকরা হলেনÑ পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁও গ্রামের মো. আলী (২৩), বাউরি গ্রামের মো. সোহানুর রহমান (২৫) এবং জগন্নাথপুর পৌরসভাধীন কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম (২৬)। এই তালিকায় রয়েছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফয়েজুর রহমানের ছেলে অভ্র ফাহিমও (২০)। ফাহিম সাগরে মারা গেছে বলে জানিয়েছে এনামুল কবির মুন্না নামের তার এক মামা।

দিরাইয়ের তারাপাশা গ্রামের মারা যাওয়া সুহানুর রহমান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘প্রতি জন ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে গত ১৭ জানুয়ারি গ্রিসের পথে রওনা হন। প্রথমে তাদের ঢাকা থেকে বিমানে সৌদি আরব, সৌদি আরব থেকে মিশর, মিশর থেকে লিবিয়া নেওয়া হয় এবং লিবিয়া নেওয়ার পর অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়। কয়েকদিন তাদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। গত শনিবার আমার চাচাতো ভাই রুহান জানিয়েছে, এহিয়াসহ দিরাইয়ের চারজন সাগরে মারা গেছে। তাদের বোট সাগরে পথ হারিয়ে ৫-৬ দিন ঘুরেছে, খাবার ও পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা সাগরের পানি খেয়ে মারা গেছেন।

তিনি আরও বলেন, দোয়ারাবাজার উপজেলার জসিম উদ্দিন নামের এক দালালের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হয়েছিল। জসিম উদ্দিন লিবিয়ায় থাকেন, সুনামগঞ্জের তরুণদের সাগরপথে গ্রিসে পাঠান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। যাত্রাপথে তাদের কোনো জিপিএস বা যোগাযোগের ডিভাইস দেওয়া হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মৃতদের লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়। পাচারকারী চক্রের অনেকের বাড়ি সিলেটে বলেও তিনি দাবি করেন।

সুনামগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘যেহেতু তারা বৈধপথে যাননি, তাই সরকারিভাবে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। তবে আমরা স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তথ্য সংগ্রহ করতে, যাতে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’

প্রসঙ্গত, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তবরুক থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। তবরুকসহ লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেম ঘরে’ এখনো অনেক বাংলাদেশি আটক থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাকে দালালেরা ‘গেম’ বলে। লিবিয়ার যেসব জায়গায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয় এবং পরে নৌকায় তোলা হয় সেই জায়গাগুলোকে দালাল ও অভিবাসন প্রত্যাশীরা ‘গেম ঘর’ বলে।