গ্রামের শ্রমনির্ভর পেশা ছেড়ে ক্রমেই রাজধানীমুখী হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ। ইটভাটা, কৃষিকাজ বা দিনমজুরির মতো কঠিন শ্রমের কাজ থেকে বেরিয়ে তুলনামূলক কম কষ্টে বেশি আয়ের আশায় অনেকেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালনায় যুক্ত হচ্ছেন। এতে তারা লাভবান হলেও বৃহৎ অর্থে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। অবৈধ এসব অটোরিকশা ও অপ্রশিক্ষিত চালকের কারণে বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট, ঘটছে দুর্ঘটনা এবং নগরের ট্রাফিকব্যবস্থায় সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা খুরশিদ এমনই একজন অটোরিকশাচালক। আগে তিনি কাজ করতেন ইটভাটায়। তার সঙ্গে কথা হলে জানান, ইটভাটার কাজ অনেক পরিশ্রমের। সেই তুলনায় অটোরিকশা চালানো সহজ এবং আয়ও বেশি। একই কথা বলেন গাজীপুরের শফি। তার ভাষ্য, শহরে অটোরিকশা চালিয়ে দৈনিক ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। গ্রামে কৃষিকাজ করে এতটা উপার্জন সম্ভব নয়। এছাড়া গ্রামে সবসময় কৃষিকাজ থাকেও না এবং ওই কাজ অত্যন্ত পরিশ্রমের।
গবেষণা সংস্থা ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের প্রায় ৭৫ শতাংশের আগে রিকশা চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাদের একটি বড় অংশ কৃষিকাজ, দিনমজুরি বা নিম্নআয়ের অন্যান্য পেশা থেকে এসেছেন। অর্থাৎ, অটোরিকশা এখন বিকল্প জীবিকার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অপ্রশিক্ষিত চালকরা সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি নানা দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠছেন বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
অভিজ্ঞতাহীন চালক ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে বাড়ছে দুর্ঘটনা:
তথ্য অনুসারে, অটোরিকশার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের আড়ালে তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। চালকদের অধিকাংশই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ এবং গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা খুবই কম। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ চালকের সড়কে যান চালানোর অভিজ্ঞতা দুই বছরেরও কম। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারি রিকশার প্রায় ৩০ শতাংশ যাত্রী কোনো না কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, যা প্যাডেল রিকশার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গুরুতর আহত হওয়ার হারও ব্যাটারিচালিত রিকশায় বেশি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানায়, দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১৬.৫ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ২১ শতাংশের জন্য দায়ী ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার। হালকা কাঠামো, দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে চলাচল- সব মিলিয়ে এই যানগুলো এখন কার্যত ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে সরকারের হাজার কোটি টাকা ক্ষতি : সিপিডির তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ঢাকায়। এর ৯৫ শতাংশের কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই। দৈনিক এসব রিকশা ব্যবহার করেন ১১ কোটির বেশি মানুষ। তবে অটোরিকশার এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমান্তরালভাবে বেড়েছে বিশৃঙ্খলা।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, অবৈধ এসব অটোরিকশার কোনোটিতে চারটি, কোনোটিতে আবার ছয়টি করে ব্যাটারি লাগানো। এসব ব্যাটারি সাধারণত ১২ ভোল্টের, চার্জ হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা।
জানা গেছে, এই বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। এতে শিল্পকারখানা ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ হুকিং, গোপন সংযোগ এবং অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্টের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠেছে, যেখানে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকা-ের ঝুঁকিও বাড়ছে।
নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাড়বে সংকট:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোরিকশা একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি করলেও এটি এখন বহুমাত্রিক সংকটের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হঠাৎ করে এই যান নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়, বরং সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য অনেক বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। গরম বাড়লে লোডশেডিং বাড়বে। দিন দিন এই সমস্যা আরও বাড়বে।
ক্রমবর্ধমান এই সমস্যা সমাধানে চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, লাইসেন্স প্রদান, বয়সসীমা নির্ধারণ এবং জোনভিত্তিক চলাচলের প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বন্ধ করা, লাইসেন্সবিহীন কারখানা বন্ধ করা এবং পরিকল্পিত চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মিনিবাস বা কমিউনিটি পরিবহনের মতো বিকল্প চালু করে অটোরিকশার ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট, দুর্ঘটনা ও সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। অভিজ্ঞতাহীন চালক ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বর্তমানে ব্যাটারি রিকশা মূল সড়ক দাপিয়ে বেড়ালেও যাতে দ্রুত কমে আসে, সেজন্য আমাদের ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে। একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একদিকে যেমন জীবিকার মাধ্যম, অন্যদিকে নগরের সড়কের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই এই খাতকে সম্পূর্ণ বন্ধ না করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আনা এবং নিরাপদ বিকল্প চালু করা হতে পারে কার্যকর সমাধান। এখন সময় এসেছে সরকার, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার, না হলে রাজধানীর সড়কে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, সহজলভ্য ও কম খরচের কারণে দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও নিয়ন্ত্রণহীন এই যানবাহন এখন নগরজীবনের জন্য এক নীরব হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া গ্রাম থেকে শহরে আসা অপ্রশিক্ষিত মানুষ এসব চালাচ্ছে, যে কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছে বেশি। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি- সব জায়গাতেই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এটি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সরকারের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স প্রদান এবং নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করতে হবে। প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য বাসভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিকল্পিত নগর পরিবহনব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

