× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

মাসজুড়ে হাম আক্রান্ত ৩১ হাজারের বেশি

এপ্রিলে প্রাণ গেল ৪৭ শিশুর

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

যুগ যুগ ধরে হামের সংক্রমণের সঙ্গে পরিচিত দেশের মানুষ। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণত বসন্তকালে এই রোগে শিশুদের আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এবার বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্মেও এর সংক্রমণ প্রাণ হারাচ্ছে একের পর এক শিশু। শুধু এপ্রিলেই সন্দেহজনকভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৩২৫ শিশু। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৯৪ জন শিশু। এদের মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৪৭ জন শিশু। সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৫। এটিকে সংখ্যার দিক দিয়ে বিচার না করে বাবার কাঁধে নিষ্পাপ শিশুর লাশ কাঁদিয়েছে সারা দেশকে। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের টিকাদানে গাফিলতির কারণে এমন মৃত্যু আর একটিও চায় না দেশের মানুষজন।

হাম মূলত ‘মিজেলস’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, রক্তবর্ণের চোখ এবং জ্বরের চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র‌্যাশ নিয়ে হাম আবির্ভূত হয়। মিজেলস ভাইরাসটি শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত শিশু এর বাইরেও নানা রকম ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্বারা সহজে সংক্রমিত হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে শিশুর চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, এ থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এটি খুবই ছোঁয়াচে রোগ। সামান্য হাঁচি-কাশির মাধ্যমে মুহূর্তেই হামের ভাইরাস আক্রান্ত শিশুর কাছ থেকে আশপাশে থাকা অনেক সুস্থ শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে। এতে করে এটি এলাকাজুড়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চলতি বছর এমনই ঘটেছে উল্লেখ করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম মাহমুদুজ্জামান শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘চলতি বছর হামে আক্রান্ত যত শিশুকে দেখতে হয়েছে এর আগে ইতিহাসে এত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয় নি। এর অন্যতম কারণ এর অতি ছোঁয়াচে ধরণ। আক্রান্ত একটি শিশুর থেকে পুরো এলাকার শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ওই শিশুকে আইসোলেশনে নেওয়া হতো, তাহলে এমনটি ঘটত না। যেহেতু এখন এর সংক্রমণের আধিক্য বেড়েছে, সেটা যেকোনো কারণেই হোক, তাই কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর শরীরে র‌্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে। এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুর যদি শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসে বা মুখের ভেতর গভীর ঘা থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ডে বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয় কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে। নইলে এটি মহামারীতে রূপ নিতে আর বেশিদিন সময় লাগবে না’।

টিকাদানের তৎপরতায় দেশে হামের প্রকোপে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে হামে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা দেখাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম চালুর পর বর্তমানে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে ১৭ এপ্রিলের পর থেকে ওইসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমতে শুরু করেছে। এই ফলাফল টিকাদানের কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। একই প্রবণতা ৫টি সিটি করপোরেশন এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে। আশা করি, খুব শিগগিরই দেশব্যাপী টিকা দেওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করবে’।

এ সময় ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘চলমান ক্যাম্পেইনের কাভারেজ সন্তোষজনক। তবে দীর্ঘমেয়াদে হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রুটিন ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করা। এই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। জাতীয়ভাবে টিকার কাভারেজে ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত করা গেলে তখন আলাদা ক্যাম্পেইনের প্রয়োজন পড়বে না’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যান্য টিকা যেমন বাচ্চাদের ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যায় তাই ওই টিকার কাভারেজও অনেক বেশি ধাকে। তবে হামের জন্য এমআর টিকা শুরুই হয় ৯ মাস থেকে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে, তাই অনেক মা-বাবা ভুলে যান সন্তানকে এ টিকা প্রদান করতে। তাই আমার বিশেষ অনুরোধ থাকবে যদি মা-বাবারা তাদের সন্তানদের দুই ডোজ টিকা প্রদান করেন ও মোট জাতীয় কাভারেজ ৯৫ শতাংশ হয় তাহলে হাম এর প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।’

প্রথম পর্যায়ে ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সংবাদ সম্মেলনে জানায়, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন যুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি সব শিশুকে বিনা মূল্যে এক ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬১ শতাংশ। প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’ মহাপরিচালক আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় টিকা ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। রুটিন ইপিআই কার্যক্রমের টিকাও পর্যাপ্ত রয়েছে এবং আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নতুন চালান হাতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত হামের সংক্রমণের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। হাম-সংক্রান্ত নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি মাসের ৩ তারিখ হামে সন্দেহজনকভাবে আক্রান্ত হয় ৯৭৪ জন। নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা দেখা যায় ৪২ জন। সন্দেহজনকভাবে মৃত্যু হয় ৩ জনের। এর পরের তিন ২ দিন সংক্রমণের সংখ্যা হাজারের নিচে থাকলেও ৬ তারিখের পর তা প্রায় প্রতিদিনই হাজারের ঘর পার করে। প্রতিদিন মৃত্যুও হয় উল্লেখযোগ্য হারে।

এদিকে শিশুসন্তানদের নিয়ে আতঙ্কিত অভিভাবকরা বলছেন, সরকারের টিকা না দেওয়ার দায়ভার কেন নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ দিয়ে দিতে হবে? রাজধানীর গোড়ান এলাকার বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, ‘গত একটা মাস আমার বাসা প্রায় হাসপাতাল ছিল। প্রথমে ছোট মেয়েটা স্কুল থেকে এসে জ¦রে পরে। এক দিনের মাথায় শরীরে র‌্যাশ দেখা দেয়। এরপরের দিনই বড় মেয়ে এবং আমাদের সঙ্গে থাকা ছোট ভাইয়ের দুইটা বাচ্চাও হামে আক্রান্ত হয়। তারা সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্ত্রী এবং ভাইয়ের স্ত্রীও হামে আক্রান্ত হয়। আল্লাহর রহমত যে সারাক্ষণ চিকিৎসকের পরামর্শে ছিলাম নইলে কী ঘটত কে জানে। তবে শত চেষ্টা করেও নিজের শিশুসন্তানকে বাঁচাতে পারেননি মুগদার বাসিন্দা রিফাত ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত হওয়ার ৪ দিনের মাথায় ১১ মাসের ছেলেটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা ভারী সবাই জানেন। বাচ্চার মা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। সারাক্ষণ বিলাপ করতে থাকেন। এমন মৃত্যু আর চাই না। এর জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন আমাদের হাম নিয়ন্ত্রণে যা যা করণীয় তার সব যেন করা হয়।’

হাম রোধে টিকা গ্রহণের বিকল্প নেই উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময় দেশে কোনো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি হয়নি। আর তারই ফল ভোগ করছে নিষ্পাপ শিশুরা। এখন সরকার যেহেতু জোরেশোরে টিকাদান কর্মসূচি পালন করছে, তাই প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। এই টিকাই রক্ষা করতে পারে শিশুপ্রাণ।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!