এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে (৫২) হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) শফিকুল ইসলাম। অন্যদিকে আন্ডারওয়ার্ল্ড-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো শত্রুতা ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি আসন্ন কুরবানির ঈদের পশুর হাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই টিটন হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ হত্যাকা-ে একাধিক কারণ খতিয়ে দেখছে।
গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরে আইনশৃঙ্খলায় শিথিলতায় আইনের ফাঁক গলে সানজিদুল ইসলাম ইমন ও এবং টিটন দুজনই কারাগার থেকে মুক্তি পান। ইমন তার এলাকা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিলেও টিটন এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন না। টিটনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই ও কুখ্যাত গ্যাংস্টার তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বড় ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যাকা-ে টিটনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। টিটনের সঙ্গে তার বোন জামাই আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের দীর্ঘদিনের বিরোধও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
এদিকে টিটন নিহত হওয়ার খবর পেয়ে তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন যশোর থেকে ঢাকায় এসে নিউমার্কেট থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে অজ্ঞাতনামা ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। হত্যার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১১ ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন। গত বছরের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়ে হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জে বসবাস করতেন তিনি।
টিটনের বড় ভাই রিপনের দাবি, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে টিটনকে। গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ পিচ্চি হেলালের সঙ্গে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনের বিরোধ চলছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। তবে সেই বিরোধ দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছিলেন টিটন। কিন্তু তার আগেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তিনি। গরুর হাটের ইজারার দ্বন্দ্বেই টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জোর দাবি টিটনের ভাইয়ের।
গতকাল দুপুরে নিউমার্কেট থানায় মামলা করার পর রিপন সাংবাদিকদের জানান, মোহাম্মদপুরের বসিলার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ ছিল টিটনের। জামিন পাওয়ার পর দুইবার যশোরে গিয়েছেন টিটন। এর মধ্যে একবার ঈদের সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। হত্যাকা-ের কয়েক দিন আগে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বসিলার গরুর হাট নিয়ে বিরোধের কথা কিছুটা বলেছিলেন। তাদের সঙ্গে ঝামেলা চলছিল। পরে জানান, বড় ভাই ঠিক হয়ে যাবে। অসুবিধা নাই, দোয়া কইরেন,’ যোগ করেন রিপন। রিপনের ভাষ্য, গত ২৬ এপ্রিল টিটন ফোন দিয়ে জানায়, তার সঙ্গে পিচ্ছি হেলাল, বাদল ও কিলার বাদল, কাইলা বাদল, শাজাহান, রনি, ভাঙারি রনিদের বসিলা গরুর হাটের ইজারার শিডিউল নিয়ে ঝামেলা চলছে। এর পরের দিন সোমবার ফোন দিয়ে বলে, ওরা ভাইকে ডাকছে। সবার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করবে। এরপর আর কথা হয়নি।’ পুলিশকে সব জানানো হয়েছে, আমরা চাচ্ছি ন্যায়বিচার হোক। সবার কাছে অনুরোধ, যেন আমরা ন্যায়বিচার পাই, বলছিলেন রিপন। আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইমনের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। এমনিতে ছোটখাটো ঘটনা ভাই-বোনের মধ্যে থাকতেই পারে। এটা খুনের পর্যায়ের কোনো বিরোধ বলে মনে করি না।
এদিকে নিউমার্কেট থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের কথা উল্লেখ থাকলেও, ভুক্তভোগীর পরিবারের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারিতে কিলার বাদল, ডাগারি রনিসহ অন্যদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা নির্দিষ্ট কিছু নাম পেয়েছি, যারা ঘটনার সময় ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। সিসিটিভি ফুটেজে মাস্ক পরিহিত ঘাতকদের দেহের গড়ন দেখে তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এটি কোনো আকস্মিক হামলা ছিল না। বরং বসিলা গরুর হাটের ইজারাসংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর নাম করে টিটনকে ডেকে নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই কিলিং মিশনের নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সরাসরি নির্দেশনা এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত চার কিলার ও সহযোগীর নাম বেরিয়ে এসেছে। সূত্রের দাবি, বসিলা গরুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক দিন ধরে টিটনের সঙ্গে পিচ্চি হেলালের উত্তেজনা চলছিল। বিরোধ মেটানোর কথা বলে পিচ্চি হেলাল নিজে তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে মঙ্গলবার রাতে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। টিটন সরল বিশ্বাসে বা সমঝোতার আশায় সেখানে পৌঁছালে ওত পেতে থাকা ঘাতক দল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অপর একটি সূত্র বলছে, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার বদলা নিতেই পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এই হত্যাকা-। কিলিং মিশন চালাতে মাসখানেক আগে দুবাই থেকে ঢাকায় আসেন মোহাম্মদপুরের বাদল ওরফে কিলার বাদল। দুবাই বসে এই খুনের পরিকল্পনা করেন সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই পুরস্কার ঘোষিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ। টিটন কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে টার্গেট করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ (জোসেফ)। ভাইয়ের খুনের বদলা নিতে দুবাই বসেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ছক মাফিক মাসখানেক আগে জোসেফের সহযোগী ও তার কিলার বাহিনীর অন্যতম সদস্য বাদল ওরফে কিলার বাদলকে দুবাই থেকে পাঠানো হয় দেশে। ফিরেই ‘কামলা’ দিয়ে টিটনের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে থাকেন তিনি। সেনাপ্রধানের চাকরি শেষ হওয়ার পর তার ভাই যোসেফ দুবাই গেলে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কিলার বাদলও পাড়ি জমান সেই দেশে।
অপরদিকে, গতকাল বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) শফিকুল ইসলাম বলেন, আপনারা জানেন, সে (টিটন) নিজেও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল, প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও হাট ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে এ হত্যাকা- ঘটেছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত সে বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার এজাহারে মোহাম্মদপুরের বসিলার গরুর হাঁট নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল, এ ঘটনায় পিচ্চি হেলাল ও কাইল্লা বাদলসহ অনেকের নামে উল্লেখ রয়েছে এ বিষয়ে জানেন কি নাÑ প্রশ্নে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, মামলা হয়েছে। বাদী যাদের নাম উল্লেখ করেছেন আমরা কাজ করছি। আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। আপনারা জানেন সামনে কোরবানি, গরুর হাঁট নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। এই হত্যাকা-ে করা জড়িত সেটি উদঘাটন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাট ইজারাকে কেন্দ্র করে আরও হত্যাকা- ঘটতে পারে।
বিদেশে বসে হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতীতে এমন কর্মকা- অনেকেই করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বিদেশে অবস্থানরত কারো সংশ্লিষ্টতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি যাদের এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণে দোষী সাব্যস্ত হলে ইন্টারপোলে চিঠি দেওয়া হবে। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
মঙ্গলবার রাতে ঘটনার পর অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ৫২ বছর বয়সি টিটন দুই দশকেরও বেশি সময় কারাগারে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সে কারামুক্ত হয়। সে ঢাকার রায়েরবাজার ও হাজারীবাগ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত থাকার একাধিক মামলা রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের হত্যাকারীরা পেশাদার খুনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হত্যাকা-ে অন্য কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী জড়িত আছে কি না, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে।
গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট ও শহিদ শাহ নেওয়াজ হল সংলগ্ন রাস্তায় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে টিটন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়রা দুর্বৃত্তদের ধাওয়া দিলে তারা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে টিটনকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

