ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা পিচ্চি হেলালের

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৫:৪৪ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্য ফিল্মি স্টাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। ঘটনার চার দিনেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এদিকে পরিবারের দাবি, টিটন হত্যার ঘটনা ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে পিচ্চি হেলাল। অবশ্য পিচ্চি হেলাল হত্যায় জড়িত নয় বলে জানিয়েছে। শুরু থেকেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট ছায়া তদন্ত করছে, তারা বলছে, মামলায় কিছু অগ্রগতি রয়েছে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, নিউ মার্কেট থানায় দায়ের হওয়া মামলা শিগগিরই ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হবে। ডিবি তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি বিশ্লেষণ করে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করা হবে। ঘটনার দিন টিটন মোবাইল ফোন সঙ্গে না নেওয়ায় তার অবস্থান ও কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিলÑ সেটা বের করতে সময় লাগছে।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব রূপালী বাংলাদেশকে জানান, টিটন হত্যা মামলায় এখনো অগ্রগতি নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই শুটারসহ কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের অনুসারী কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ডিএমপির নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. নাসিম এ গুলশান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ধরে শুটারকে শনাক্তের কাজ চলছে। সঙ্গে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারে কাজ চলছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে তিন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ একাধিক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর নাম সামনে এসেছে। চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। এর মধ্যে অন্যতম সন্দেহভাজন টিটনের বন্ধু শীর্ষ সন্ত্রাসী ইনামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল। আলোচনার সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোটভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামও। জোসেফ তার বড় ভাই হারিছের সহায়তায় হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

মোহাম্মদপুর বসিলার কোরবানির পশুর হাট নিয়ে বিরোধে টিটন খুন হতে পারে- এমন দাবি টিটনের বড় ভাই রিপনের। গোয়েন্দাদেরও প্রাথমিক দাবি তাই। তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি। গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন টিটন। এ ঘটনায় তার ভাই বাদী হয়ে মামলা করলেও এখন পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ৩৭টি সিসিটিভির ফুটেজ থেকে দুইজন শুটারকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে ডিবি এবং র‌্যাব। সেই সঙ্গে ব্যাকআপ টিমে থাকা সদস্যদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

ডিএমপির (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, টিটন হত্যার মূল কারণ এলাকার আধিপত্য এবং আসন্ন কোরবানির গরুর হাট নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এ হত্যাকাণ্ডে যারাই জড়িত থাকুক তা উদঘাটন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবারের দাবি- টিটন হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে পিচ্চি হেলাল:

টিটনের বড় ভাই রিপনের দাবি, হত্যার পর একটি অডিও ছড়িয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন পিচ্চি হেলাল। গতকাল শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিপন বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রাতে আমার ছোট ভাই টিটনকে হত্যার পর পিচ্চি হেলাল একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে দিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করছে। সে আমাদের পারিবারিক কলহের যে দাবি করেছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। মূলত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতেই সে এই অপকৌশল নিয়েছে। আমাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। ইমন একজন উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পিচ্চি হেলাল নিজের অপরাধ ঢাকতে এসব আবোল-তাবোল বলছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উল্লেখ করে রিপন বলেন, পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এ ছাড়া, জেলখানায় থাকাকালীনও টিটনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। অডিও রেকর্ডে ফোন ফরেনসিক করার চ্যালেঞ্জের জবাবে নিহতের বড় ভাই বলেন, আমি আমার ফোন ফরেনসিকে দিতে প্রস্তুত। তবে দাবি জানাচ্ছি, পিচ্চি হেলালের ব্যবহৃত সব কটি মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিকে পাঠানো হোক। তাহলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। এ নৃশংস হত্যাকা-ের দ্রুত বিচার এবং পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

এদিকে নিহত টিটনের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি। এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলালসহ তার তিন সহযোগীÑ বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান এবং রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর দাবি, বসিলার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েই মূলত টিটনের সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছিল। ঘটনার এক সপ্তাহ আগেও ছোট ভাই খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে তার যোগাযোগ হয়েছিল। টিটন দীর্ঘদিন কারাবাসে ছিলেন। একই সময়ে তিনি নিজে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছিলেন। ২০১৮ সালে দেশে ফেরেন তিনি। তখনো টিটন কারাগারে ছিলেন।

রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকের কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান টিটন। মুক্তির পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবার ও অন্যদেও সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন।

এদিকে, গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন মার্ডারের ঘটনার ছায়া তদন্ত চলছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউমার্কেটে দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের শনাক্ত করতে র‌্যাবের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। টিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং এর পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ছায়া তদন্ত করছি।

ভগ্নিপতি ইমনই খুন করেছে টিটনকে, দাবি পিচ্চি হেলালের : গণমাধ্যমে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল টিটন হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, গত এক মাসের মধ্যে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে কথা বলতে একটি শব্দও উচ্চারণ হয়নি। পিচ্চি হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহলে টিটনের শত্রু কে? টিটনই বলে গেছে যে ইমন ওকে মারতে চায়। পারিবারিকভাবে ওর সমস্যা আছে। টিটনের নিজের পরিবারের মধ্যেই বিরোধ ছিল। তার বোন ও বোন জামাইয়ের (ইমন) সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন ছিল। তারা দুজনই চেয়েছিল টিটন মারা যাক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। হাটের ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিটন আদৌ কোনো শিডিউল নিয়েছিল কি না তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের রেকর্ড যাচাই করলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। আমার জানা মতে, ওর তো এসব ঝামেলায় আসার কথা না।