দেশে কিডনি ও হৃদরোগীদের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। তাদের পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এমন রোগীর পরিবারের জন্য আগামী অর্থবছরে সুখবর দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভুগছেন। কিন্তু কিছু রোগীর প্রতিবছর ও নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কিডনি ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর (এটি) প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। একই সঙ্গে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আগামী বাজেটে অব্যাহতি পেতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনেক কর্মকর্তা বলেন, জীবনরক্ষাকারী এই চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর বিদ্যমান উচ্চ কর কাঠামো কমানো হলে ডায়ালাইসিস সেবার খরচ কিছুটা কমে আসতে পারে। দেশের কোটি কোটি কিডনি রোগীর চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার।
কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এইচএস কোড ৯০১৮৯০৩০-এর আওতায় হার্ট স্টেন্ট, অ্যাঞ্জিওগ্রাফিক ক্যাথেটার ওয়্যার, গাইড ক্যাথেটার ও বেলুন আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, এইচএস কোড ৯০১৮৯০২০-এর আওতায় কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন ও বেবি ইনকিউবেটর আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর মোট করহার মাত্র ২ শতাংশ। এসব পণ্যে কোনো কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক বা ভ্যাট নেই। এই পণ্যে কেবল ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপ করা হয়। এ সব পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান ২ শতাংশ এআইটি আগামী বাজেটে অব্যহতি প্রদান করা হতে পারে।
অন্যদিকে, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম করসহ মোট করহার দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডায়ালাইসিস এখন বিলাসী চিকিৎসা নয়, এটি জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা। কিন্তু যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ করের কারণে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা গত ১০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারের কাছে এসব যন্ত্রপাতি আমদানিতে করহার কমানোর জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। বর্তমান সরকার যদি কর অব্যহতি দেয় তা হলে রোগীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।’
তিনি বলেন, ‘দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও ডায়ালাইসিস সেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক রোগী নিয়মিত ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে না পেরে মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে একটি ডায়ালাইসিস মেশিনের দাম কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা। এর সঙ্গে আরও বেশকিছু লজিস্টিক প্রয়োজন হয়। যেমনÑ রক্ত পরিশোধনের ফিল্টার, রক্ত পরিবহনের টিউব সেট। এগুলোতেও কর অব্যহতি প্রয়োজন।’
বর্তমানে সরকারি বাদে অন্য যেকোনো হাসপাতালে একবার ডায়ালাইসিস করাতে একজন রোগীর খরচ হয় আড়াই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতি মাসে কমপক্ষে ৮ বার ডায়ালাইসিস দিতে হয়। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক রোগীর পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. আহসান হাবিব বলেন, ‘যে ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেগুলোর ক্ষেত্রে করনীতি মানবিক হওয়া প্রয়োজন। হার্ট স্টেন্টে ২ শতাংশ আর ডায়ালাইসিস যন্ত্রে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ কর যৌক্তিক নয়।’ তার মতে, কর কমানো হলে শুধু আমদানি ব্যয়ই কমবে না, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়ালাইসিস সেন্টারগুলোর পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা হ্রাস পাবে, যার সুফল রোগীরা পাবেন। তবে শুধু কর কমালেই হবে না। এর সুফল যাতে রোগীরা ভোগ করতে পারে সে ব্যাপারে সরকারের মনিটরিং করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি অগ্রিম কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি ভ্যাটেও ছাড় দেয়, তা হলে দেশে কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।’ বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী গত ১ দশকে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই মহামারিতে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার যে ক্ষমতা, সে অনুযায়ী এই নতুন রোগীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগীকে ট্রান্সপ্লান্ট, ডায়ালাইসিস এবং অন্যান্য চিকিৎসা দিতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অথবা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছে।

