ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ট্রাম্পের কড়া বার্তা

ইরান বলছে ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২৬, ০১:৪০ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে। গত মাসের যুদ্ধবিরতির পর এবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় আকারের হামলা শুরু হতে পারে। মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য অভিযানে শুধু বিমান হামলাই নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরে সরাসরি কমান্ডো অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পারমাণবিক সরঞ্জাম উদ্ধারে বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে সরাসরি স্থলযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্বের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরিই তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু যুদ্ধবিরতির কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে মনে করছে তেল আবিব। ফলে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

খার্গ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা : সামরিক সূত্রগুলো বলছে, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। দ্বীপটি ইরানের জ্বালানি রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এটি দখল করতে পারলে তেহরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে পশ্চিমা সামরিক পরিকল্পনাকারীরা। একইসঙ্গে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে আগের চেয়ে আরও ব্যাপক বিমান হামলার বিকল্পও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলা শুরু হলে পুরো অঞ্চল আবারও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। চীন সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি দ্রুততর করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না এবং হরমুজ প্রণালি অবশ্যই খুলে দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে ইরানের বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন শত শত কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ছে তেহরান।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকেও ইরান ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, বেইজিংও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করছে। একইসঙ্গে তাইওয়ান প্রশ্নেও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’ ইরান : অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সফররত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ওয়াশিংটন যদি আন্তরিক না হয়, তাহলে তেহরান আলোচনায় আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান দায়িত্ব পালন করে আসছে এবং যারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িত নয়, তারা সমন্বয়ের মাধ্যমে চলাচল করতে পারবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং প্রয়োজন হলে ইরান আবারও যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।

আরাগচির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। এ ধরনের ‘বিরোধপূর্ণ বার্তা’ তেহরানের আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি : ইরানকে ঘিরে নতুন উত্তেজনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া গঠনের জন্য সৌদি আরব ও কাতারকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে আমিরাত। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর থেকে আবুধাবি নিজেকে বেশি ঝুঁকিতে মনে করছে। ফলে তারা আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।

কিন্তু সৌদি আরব তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছে। রিয়াদ সামরিক সংঘাতের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সৌদি আরব ও আমিরাত আলাদাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নিলেও কোনো যৌথ সামরিক জোট গঠন করতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট ও কৌশলগত বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠতা : সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরানি হামলা প্রতিহত করতে আমিরাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছিল। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরবসহ অধিকাংশ আরব দেশ এখনো প্রকাশ্যে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে আরব বিশ্বের জনমতও ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ। ফলে অনেক দেশ সরাসরি ইসরায়েলঘেঁষা সামরিক জোটে যোগ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ : বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইরান ইতোমধ্যে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেকোনো মূল্যে এই রুট খোলা রাখতে চায়। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যৎ সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারও বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

দীর্ঘ মিশন শেষে ফিরছে মার্কিন রণতরি : এদিকে প্রায় বছরব্যাপী সামরিক অভিযান শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে বিশ্বের অন্যতম বড় বিমানবাহী রণতরি ‘জরাল্ড আর ফোর্ড’। ভেনেজুয়েলা ও ইরান অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই রণতরি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে মার্কিন শক্তির অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ড্রোন পরিচালনায় বিশেষ সক্ষমতার কারণে এই রণতরি সাম্প্রতিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও দীর্ঘ মিশনের সময় এতে অগ্নিকা- ও কারিগরি ত্রুটির ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন সংঘাতের শঙ্কা : মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে নতুন করে বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে, অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই পক্ষের অবস্থান দিন দিন আরও কঠোর হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভক্ত অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েকদিন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সামান্য ভুল হিসাবও পুরো অঞ্চলকে নতুন এক ভয়াবহ সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।