একটা শিশুর শরীরে লালচে দাগ কি রাষ্ট্রের কপালে ভেসে ওঠা লজ্জার বা ব্যর্থতার দাগ নয়? আর কতজনের মৃত্যু হলে আমরা সমবেতভাবে বলব, ‘হাম, তুই এবার থাম।’ একবিংশ শতাব্দীতে, টিকাÑসম্ভব এক রোগে মৃত্যুর খবর যখন জেলা থেকে জেলায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই প্রশ্নটা সবারই বিবেকের। হাম কেন থামছে না? হামকে থামানো অসম্ভব নয়। বিশ্বের বহু দেশ এটাকে সম্ভব করেছে। টিকা আছে, জ্ঞান আছে, কাঠামো আছে। নেই শুধু ধারাবাহিকতা আর কঠোরতা। আমরা কি এখনো বলব, ‘সময় লাগবে।’ একটি শিশুর শ্বাসকষ্টের সময় কি ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে? এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং ভুক্তভোগীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি না জাগি, তাহলে ইতিহাস লিখে রাখবে, টিকা-সম্ভব এক রোগে ২০২৬ সাল বাংলাদেশ পরাজিত হয়েছিল নিজেদের গাফিলতি ও ব্যর্থতার কারণে।
হাম যদি এখনই থেমে না যায়, তবে তা শুধু একটি রোগের বিস্তার ঘটাবে না, এটি হয়ে উঠতে পারে নীরব এক মহামারির ছায়া। প্রতিটি শিশুর জ্বরের ভেতর লুকিয়ে থাকবে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। প্রতিটি উপেক্ষার দিন গড়ে তুলবে আরও গভীর বিপদের দেয়াল। সময় তখন আর সতর্কবার্তা শোনাবে না, শুধু ক্ষয় আর কান্নার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি রেখে যাবে। হাম না থামলে বা আরও বেড়ে গেলে তা আর শুধু স্বাস্থ্যবিষয়ক খবর থাকবে না, হয়ে উঠবে প্রশাসনিক অন্ধত্বের এক নির্মম দলিল। প্রতিটি সংক্রমণ তখন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে জমে থাকা ফাইলের মতোই নিষ্প্রাণ, আর প্রতিটি মৃত্যু হয়ে উঠবে ‘সম্ভাব্যতা ছিল’ এই বাক্যের অন্ত্যেষ্টি। রাষ্ট্র যখন টিকা ও প্রস্তুতির বদলে ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা সাজায়, তখন রোগ নয়, উদাসীনতাই সবচেয়ে বড় সংক্রামক ব্যাধি হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ সমন্বিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরে হাম-সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা গত কয়েক বছরের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী। কয়েকটি জেলায় ছোট ছোট ক্লাস্টার তৈরি হয়েছে; কোথাও স্কুলে, কোথাও বস্তিতে, কোথাও হাসপাতালের ওয়ার্ডে। প্রতি ঘণ্টায় মৃত্যুর খবর আসছে। সংখ্যা যতই হোক, এভাবে একটি শিশুর মৃত্যুও সভ্যতার কাছে পরাজয়। তাই, হামকে থামাতে হবে, আজই, এখানেই। নয়তো প্রতিটি কাফনে মোড়া শিশুদেহ ব্যর্থতা ও নীরবতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তার প্রভাব এখন স্পষ্ট। বহু শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা পায়নি। ফলে জনসংখ্যার একটি অংশ ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এ পড়ে গেছে। এই ফাঁকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে তাকে অবিচ্ছিন্ন নজরদারি ও উচ্চ কভারেজ ধরে রাখতে হবে। কয়েক বছরের ঢিলেমি মুছে দিতে পারে বহু বছরের সাফল্য।
হাম ইস্যুতে রাজনৈতিক দোষারোপও শোনা যাচ্ছে। আলোচনা চলছে, কোন সরকারের সময় টিকাদান কমেছে, কে অবহেলা করেছে। ব্যর্থতা নিয়ে রয়েছে আরও বেশি অভিযোগ। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রথমত আগাম সতর্কতা ধরতে না পারা। কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাদানে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। রুটিন ইপিআই কভারেজ ৯৫ শতাংশের নিচে নামলেই হাম ঝুঁকি বাড়ে, এটা জানা বিজ্ঞান। তবু ঝরে পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে দ্রুত ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইন শুরু করতে দেরি হয়েছে। আগাম ডেটা অ্যালার্ট থাকলেও তা থেকে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা হয়নি। এটাই প্রথম প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এরপরে আছে মাঠপর্যায়ে নজরদারির দুর্বলতা। কে না জানে যে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। একটি কেস মানেই দ্রুত কনট্যাক্ট ট্রেসিং, মাইক্রো-প্ল্যানিং, ব্লকভিত্তিক টিকাদান দরকার। অনেক জেলায় সন্দেহভাজন কেস রিপোর্টিং দেরিতে হচ্ছে, ল্যাব কনফারমেশন ও রেসপন্স টিম মোতায়েনেও বিলম্ব। ফলে ছোট ক্লাস্টার বড় হচ্ছে। রোগ নজরদারিকে বাস্তবসম্মত শক্তিশালী না করা দায় সরকার এড়াতে পারে না। এসবের সঙ্গে রয়েছে হাসপাতাল প্রস্তুতিতে ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টার্গেটেড পদক্ষেপের অভাব, ভ্যাকসিন নিয়ে গুজব মোকাবিলায় দুর্বলতা ইত্যাদি।
আইইডিসিআর’র উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভাইরাস রাজনীতি বোঝে না। টিকাদান কর্মসূচি কোনো সরকারের নয়, এটি রাষ্ট্রের কর্মসূচি। ধারাবাহিকতা না থাকলে এমনটাই হবে। এখন দোষারোপ নয়, দ্রুত ঘাটতি পূরণ জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আজকের এই পরিস্থিতির জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা ঠিক নয়। দায়ী সার্বিক ব্যবস্থাপনা। এটা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; স্থানীয় সরকার, শিক্ষা বিভাগ, সামাজিক সুরক্ষাÑ সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। স্কুলভিত্তিক ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ না করলে ফাঁক পূরণ হবে না। আর শুধু ঘোষণা দিয়ে দায় শেষ করলে চলবে না। প্রয়োজন মাইক্রোপ্ল্যানিং , দরকার ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা ও বাড়ি বাড়ি অনুসন্ধান।
তিনি আরও বলেন, বলা হচ্ছে, গত সরকার হাম প্রতিরোধে টিকা প্রদানে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছে। এটা শতভাগ ঠিক। কিন্তু তাই বলে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব? অতীতের ঘাটতি থাকলে বর্তমানের দায়িত্ব দ্বিগুণ। টিকাদান একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি। এক সরকারের ব্যর্থতা আরেক সরকারের অজুহাত হতে পারে না। জনস্বাস্থ্য কোনো দলীয় পোস্টার নয়। হাম রাজনীতি বোঝে না। ভাইরাস ভোট চায় না। আজ যে শিশু সুরক্ষিত নয়, তাকে রক্ষার দায় সবার। এই লড়াইয়ে দোষারোপের চেয়ে দায়বদ্ধতা বড়। হাসপাতাল যদি সংক্রমণের ঘর হয়ে ওঠে, তা বদলাতে হবে। টিকার ফাঁক থাকলে তা পূরণ করতে হবে। গুজব যদি আগুন ছড়ায়, তার মাথায় তথ্যের পানি ঢালতে হবে।
ডা. জাকিয়া বলেন, শিশুর জ্বর-র্যাশ নিয়ে যখন মা-বাবা হাসপাতালে ছুটছেন, সেখানে যদি আলাদা ট্রায়াজ না থাকে, আলাদা ওয়ার্ড না থাকে, তাহলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে সবার আগে। একটি কেস ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। জরুরি বিভাগ বা বহির্বিভাগে আইসোলেশন না থাকলে ‘নসোকোমিয়াল ট্রান্সমিশন’ হয়েই যায়। আমাদের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে কি হাম-সন্দেহভাজন রোগীর জন্য আলাদা কর্নার আছে? স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা আছে? এখন জোর দিতে হবে এসব দিকেও। হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকলে হাম দ্রুত ছড়াতে পারে। শিশু ওয়ার্ডে ভিড়, একই কক্ষে একাধিক রোগী রাখা, এসব কারণে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ বাড়ছে। হামকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করলে চলবে না। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আই চৌধুরী বলেন, হাম থামাতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ এমআর টিকা দিতে হয়। কাগজে-কলমে ভালো কভারেজের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে কিছু জেলা ও ঝুঁকিপূর্ণ পকেটে ‘মিসড চাইল্ড’ থেকে যাচ্ছে। সেই ছোট ফাঁক দিয়েই ভাইরাস ঢুকে পড়ে। গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদানে বিঘœ, শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠী ও প্রত্যন্ত চর-হাওর অঞ্চলে পৌঁছতে না পারা, এসব মিলিয়ে একটা ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এখন সেখান থেকে বের হতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার কথা বলছেন, ভ্যাকসিন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যাকসিনবিরোধী প্রচার অনেক পরিবারকে বিভ্রান্ত করছে। কেউ কেউ টিকা পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ নিচ্ছেনই না। এতে সমষ্টিগত সুরক্ষা ভেঙে পড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখছেন, অনেক পরিবারই ভাবছে হাম স্বাভাবিক একটা শৈশব রোগ, একবার হলেই হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একবারের সংক্রমণ জীবনভর জটিলতা ডেকে আনতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, কে বা কারা দায়ী তার পেছনে ছোটার আগে প্রয়োজন বর্তমানকে সুরক্ষা দেওয়া। ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি সব শিশুর তালিকা হালনাগাদ করা দরকার। দরকার স্কুল, মাদ্রাসা, কারখানা-সংলগ্ন বস্তিতে বিশেষ ক্যাম্প গঠন। ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠীর জন্য দরকার মোবাইল টিম, যেখানে কেস পাওয়া গেছে সেখানে ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ অর্থাৎ আশপাশের সবাইকে দ্রুত টিকা দেওয়া দরকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সব জেলা হাসপাতালে হাম-সন্দেহভাজন কর্নার, দ্রুত ল্যাব রিপোর্টিং, ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া দরকার। টিকা নিয়ে বিভিন্ন গুজব ছড়াচ্ছে অশিক্ষিত একটি মহল। এ ব্যাপারে ইমাম, পুরোহিত, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভ্রান্ত বার্তা ও তথ্যের দ্রুত প্রতিবাদ করা উচিত। ভয়কে পরাজিত করতে মাঠে হাজির করতে হবে তথ্য। একই সঙ্গে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তদারকি কমিটি গঠন করা উচিত।
বিশ্লেষকদের শেষ কথা, হামকে যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া হয়, তা শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি হয়ে উঠবে সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত এক নির্মম আত্মসমালোচনা। প্রতিরোধের সুযোগ যখন বারবার ফসকে যায়, তখন ইতিহাস আর ক্ষমা করে নাÑ শুধু নীরবভাবে লিখে রাখে অবহেলার দীর্ঘ অধ্যায়।

