২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে শেয়ার হস্তান্তরে বিশেষ করছাড় দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা তাদের স্বজনদের ‘উপহার হিসেবে শেয়ার’ হস্তান্তরে ১০ শতাংশ উৎসে কর ছাড় দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি।
ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ২৬৭ কোটি টাকার শেয়ার উপহার পান কোম্পানির উদ্যোক্তাদের স্বজনরা। যদিও তার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই শেয়ার হস্তান্তরের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৮ কোটি টাকা। এতে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ৮২৬ কোটি টাকা।
এই করছাড়ের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী কোম্পানি ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে ‘ব্যবসায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করাসহ সিকিউরিটিজ বিষয়’ উল্লেখ করে বিবৃতিও দিয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের এই রহস্যজনক উদারতার কারণে সরকার কোনো রাজস্ব পায়নি। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি করে। যার ফলে দীর্ঘ সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেনে খরার সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই করছাড়ে পুঁজিবাজারে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তিনটি প্রধান ক্ষতিকর দিক চিহ্নিত করেছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তা হলোÑ ১. দুই অর্থবছরে সরকারের প্রায় ৮৭০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি। ২. ৭,৩৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের লকড শেয়ার অবাধে লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ৩. ভবিষ্যতে বাজার ঊর্ধ্বগামী হলে তথ্য প্রকাশ না করেই শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার তীব্র ঝুঁকি থাকছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স) বৃদ্ধি করে এবং স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি এমনিতেই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা শেয়ারবাজারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঠিক একই সময়ে, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ এক অপ্রত্যাশিত করছাড়ের ঘোষণা দেয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্পন্সর-পরিচালকদের তাদের স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা এবং সন্তানদের ১০ শতাংশ উৎসে কর না দিয়েই শেয়ার ‘উপহার’ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে দেশের শেয়ারবাজারে পারিবারিকভাবে শেয়ার হস্তান্তরের এক অভূতপূর্ব ঢল নামে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পারিবারিক শেয়ার হস্তান্তরের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আকাশচুম্বী হয়ে ৮ হাজার ২৬৭ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছায়। বছরের ব্যবধানে স্থানান্তরিত শেয়ারের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায়। এর এক বছর পর, বাংলাদেশ আইএমএফের কর্মসূচির অধীনে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে তীব্র চ্যালেঞ্জ ছিল। তবুও করমুক্ত সুবিধার আওতায় ভাই-বোনদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রাজস্ব ক্ষতি ও নিয়মের ফাঁকফোকর : করছাড়ের আগে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত তিনটি অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্পন্সর-পরিচালকরা ৪.৬৪ কোটি শেয়ার হস্তান্তর করেছিলেন, যেখান থেকে ৫ শতাংশ উৎসে কর বাবদ সরকারের প্রায় ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছিল।
ছাড় দেওয়ার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই ২৭.৭২ কোটি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়। ১০ শতাংশ করের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখান থেকে সরকারের প্রায় ৮২৬ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু করছাড়ের কারণে সরকার এক টাকাও রাজস্ব পায়নি।
রাজস্ব বোর্ডের এই রহস্যজনক ‘উদারতা’ নিয়ে কর-বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্পন্সর-পরিচালক বা ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারী ব্যক্তি যদি তাদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রি বা উপহার দেওয়া সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন আনেন, তবে তাকে জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করতে হয়। এ ছাড়া কেনাবেচার আগে তাদের শেয়ারগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘লক-ইন’ (শেয়ার বিক্রির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা) শর্তের অধীনে থাকে।
শেয়ারগুলো যখন পারিবারিক সদস্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন সেই শেয়ারগুলো স্পন্সর-স্তরের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতার বাইরে চলে যায়। যাকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হস্তান্তরিত শেয়ারের ৮৭ শতাংশ স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান বা ভাই-বোনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যারা স্পন্সর বা বৃহৎ শেয়ারহোল্ডার ক্যাটাগরির মধ্যে পড়েন না।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার আইনি প্রভাব ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘হস্তান্তরিত শেয়ারগুলো সম্পূর্ণ ‘লক-মুক্ত’ হয়েছে এবং বাজারে কেনাবেচার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আগাম জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা এক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে।’
ডিএসইর তথ্য থেকে দেখা যায়, এই হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কার্যকরভাবে তথ্য প্রকাশের আওতার বাইরে বা ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ অঞ্চলে চলে গেছে।
এই পরিস্থিতিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দিকে তাক করা একটি লোডেড বন্দুকের মতো। যেসব স্পন্সর-পরিচালক তাদের পরিবারের সদস্যদের শেয়ার হস্তান্তর করেছেন, তাদের আসল উদ্দেশ্য আমরা জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্পন্সর-পরিচালকরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রেখেছেন। অন্যদিকে, সুবিধাজনক সময়ে নিঃশব্দে তাদের শেয়ারবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পথ সুগম করা হয়েছে।’
করছাড়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ওয়ালটন : ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এই করছাড়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী কোম্পানি ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়ালটনের স্পন্সর-পরিচালকরা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে ৭,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের শেয়ার হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে ৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের শেয়ার কার্যকরভাবে ‘লক-মুক্ত’ হয়ে যায়।
শেয়ার গ্রহণকারী পারিবারিক সদস্যরা স্পন্সর-পরিচালক নন, বরং সাধারণ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিশেষ ছাড়ের ফলে ওয়ালটনের স্পন্সর-পরিচালকরা প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছেন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের শেয়ার হস্তান্তর ‘প্রচলিত সকল আইন মেনেই’ করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে, এই হস্তান্তরের দুটি উদ্দেশ্য ছিলÑ ব্যবসায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এবং কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সিকিউরিটিজ আইনের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রযুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করা। কোম্পানির মোট শেয়ারের মধ্যে ১ শতাংশের কম শেয়ার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও নির্দিষ্ট করছাড়ের দাবি সংগঠন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই করা হয়নি। নিয়মানুসারে, স্পন্সর বা পরিচালক নন, কিন্তু কোনো কোম্পানির ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিকÑ এমন সাধারণ বিনিয়োগকারীকে শেয়ার বিক্রির আগে সেটি আনলক করতে এখনো ১০ শতাংশ কর দিতে হয়।
চলতি অর্থবছরেও ধারা অব্যাহত : ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ১৮টি কোম্পানির স্পন্সর-পরিচালকরা এই করছাড়ের আওতায় ৫০৫ কোটি টাকার শেয়ার হস্তান্তর করেছেন। হস্তান্তরের পর এর মধ্যে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার শেয়ার কার্যকরভাবে ‘লক-মুক্ত’ হয়ে গেছে।
কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ক্রাউন সিমেন্ট, জিপিএইচ ইস্পাত, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, লেগাসি ফুটওয়্যার, লাভেলো, মনোস্পুল, এনসিসি ব্যাংক, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, সালভো কেমিক্যাল, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং সাউথইস্ট ব্যাংক।

