ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনায় করা মামলায় রোববার বিকেলে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। পল্লবী থানার পুলিশ মামলাটি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করে। এর পরই মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। পরে ওই ট্রাইব্যুনালের বিচারক চার্জশিট আমলে নিয়ে আগামী ১ জুন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত চার্জশিটটি আমলে নিয়ে ১ জুন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন। শুনানির পর চার্জশিটটি গ্রহণ করা হলে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আনা হয় এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী রুপা আক্তারকে।

৪৭ পৃষ্ঠার চার্জশিটে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে হত্যাকা-ে সহযোগিতার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। চার্জশিটে হত্যাকা-ের পেছনের কারণ, অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চার্জশিটে ঘটনার আগে ও পরের বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে অভিযুক্তদের চলাফেরা, ভুক্তভোগীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং সাক্ষীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাই করেই চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং হত্যার পর তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বাসায় ঘটে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ এ ঘটনা। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হলে পাশের ফ্ল্যাটের সাবলেট ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ও তার স্ত্রী কৌশলে তাকে নিজেদের কক্ষে নিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। দরজায় বারবার ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে ভবনের অন্য বাসিন্দাদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন তারা। সেখানে শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ। আর বাথরুমের একটি বালতিতে ছিল কাটা মাথা। ঘটনাস্থলেই ছিল স্বপ্না আক্তার।

পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্নাকে আটক করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সোহেল রানাকে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে। জবানবন্দিতে সে জানায়, ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল। ধর্ষণের সময় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে এবং বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে সে রামিসার গলা কেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মাথা শরীর থেকে আলাদা করে এবং দুই হাত আংশিক বিচ্ছিন্ন করে খাটের নিচে লাশ লুকিয়ে রাখে। এরপর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

রোববার আদালতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আগেই ঢাকা আইনজীবী সমিতি ঘোষণা দিয়েছিল যে, অভিযুক্তদের পক্ষে কেউ দাঁড়াবেন না।

আদালতে শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী জানান, এই মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলা। রাষ্ট্রপক্ষ দোষীদের সর্বোচ্চ সাজার প্রত্যাশা করেছে। আদালত শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়েছে। আগামী পহেলা জুন এই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

পুলিশ বলছে, ঘটনার পরপরই দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

নৃশংস এই হত্যাকা-ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যরাও এ মামলায় আসামিদের পক্ষে আইনি সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনার জন্য সরকার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুকে নিয়োগ দিয়েছে। শনিবার সিআইডি থেকে মামলার ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে গত ২১ মে রাতে রামিসার বাসা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এদিকে রোববার দুুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। রোববার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি বলেন, খুব দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

বিচার দ্রুত শেষ করতে বিশেষ বেঞ্চ প্রয়োজন : শিশু রামিসার মতো চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে হাইকোর্ট বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। রোববার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংস, নির্লজ্জ, ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য আজ গোটা জাতি অসম্মানিত। আইনজীবী হিসেবে আমাদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা হলো, এ ধরনের মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর পার হলেও শেষ হয় না। তাই দ্রুত বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্রুত বিচার কোনো বেআইনি নয়। বরং দীর্ঘসূত্রতাকে খারাপ মনে করে মানুষ। তিনি বলেন, এ ধরনের মামলার বিশাল জট কমাতে উচ্চ আদালতে অবিলম্বে বিচারক নিয়োগ, মিথ্যা মামলা বন্ধ এবং হয়রানির শিকার নির্দোষ ব্যক্তিদের জন্য ‘ক্ষতিপূরণ বোর্ড’ গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পুলিশি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে।