ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হামে মৃতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া। শুরুটা ছিল সাধারণ অসুস্থতার মতোই। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো সেরে উঠবে। কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হয়। এরপর হাসপাতালের বিছানা, অক্সিজেনের উদ্বেগ, চিকিৎসার অপেক্ষা, সবশেষে নিভে যায় প্রাণ। একমাত্র শিশুসন্তান রিফাতের খেলনা পড়ে আছে ঘরের কোণে, কিন্তু সে আর নেই। তার জন্য কেনা দোলনার রশি ধরে কান্নায় বুক ভাসাচ্ছেন মা নীলা আক্তার। দেশজুড়ে হামের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন সন্তান হারানোর মাতম চলছে দেশের ৫শ’র বেশি পরিবারে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১৬ শিশুর। আর কয়দিন পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উৎসব ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় প্রতিটি মুসলিম বাড়িতে যখন চলছে উৎসবের আয়োজন তখন নিষ্পাপ সন্তান হারানোর আহাজারিতে কাঁপছে হামে আক্রান্ত মৃত শিশুদের পরিবারগুলোর আশপাশের আকাশ-বাতাস।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-সংক্রান্ত নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রোববার জানানো হয়, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে বছরের সর্বোচ্চ ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মোট মারা গেছে ৫২৮ শিশু। ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ১০, ময়মনসিংহে দুই এবং রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে একজন করে মারা গেছে। এ সময় নতুন করে এক হাজার ৪৩৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২৮ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। আর হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এক হাজার ৩০৬ জনের শরীরে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে সন্দেহজনক হামে ৪৪২ জন ও নিশ্চিত হামে ৮৬ জন মারা গেছে। একই সময়ে সারা দেশে হাম সন্দেহে ৫০ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৬ হাজার ২১৪ জন ছাড়পত্র পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে আট হাজার ৬২২ জন।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সন্তানহারা এক বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল নীরবতা যেন চারদিকে ছড়িয়ে আছে। যে উঠোনে কিছুদিন আগেও কন্যা রুশদির হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা। রুশদির মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ও বারবার বলছিল মা আমাকে কোলে নাও। আমি বুঝতেই পারিনি ওকে আর ধরে রাখতে পারব না। তিনি বলেন, প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেইনি। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে শিশু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। এখন ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা রুশদির ছবির দিকে তাকিয়ে দিন কাটে আমাদের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ সংক্রামক রোগ নয়। সময়মতো টিকা না হলে এটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ^াসকষ্ট, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাদের মতে, সচেতনতার ঘাটতি, টিকাদানে অনিয়ম এবং অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এখনো কিছু এলাকায় টিকা নিয়ে ভয়, ভুল ধারণা এবং অনীহা রয়েছে। অনেক অভিভাবক শুরুতে রোগটিকে সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ ভেবে অবহেলা করেন। এর ফল কখনো কখনো হয়ে উঠছে অপূরণীয়।

হামে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্য পরিসংখ্যানের সংখ্যা হয়তো কেবল একটি তথ্য। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে তা একটি পৃথিবী হারানোর সমান। যে শিশুটি সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের কাছে নাশতা চাইত, বাবার কাঁধে চড়তে চাইত, ভাই-বোনের সঙ্গে খেলতÑ তার অনুপস্থিতি এখন প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হচ্ছে। দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবরের ভিড়ে সংখ্যার হিসাব সামনে আসছে বারবার। কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে রয়ে যাচ্ছে কিছু শূন্য হয়ে যাওয়া ঘর, কিছু নিস্তব্ধ উঠোন আর কিছু পরিবারের শেষ না-হওয়া অপেক্ষা। সেখানে এখনো চলছে শোকের মাতম।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের করিডর, চিকিৎসার অপেক্ষা আর শেষ মুহূর্তের অসহায় ছোটাছুটি চিত্র গত ১৫ মার্চ থেকেই স্পষ্ট। একপর্যায়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু হারানো অনেক পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে গেছে। কিন্তু শোকের পাশাপাশি এখন তাদের মধ্যে আরেকটি উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের সন্তানদের মৃত্যুর জন্য দায় থাকলে তার কোনো জবাবদিহি বা তদন্ত আদৌ হবে কি না। পরিবারগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে তারা সময়মতো চিকিৎসা পাননি, কোথাও টিকার প্রাপ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। এসব কারণে শিশুরা প্রাণ হারিয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান স্বজনরা।

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেলে হাম রোগীদের জন্য বানানো অস্থায়ী ক্যাম্পে ভর্তি এক শিশুর বাবা বলেন, আমার সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়েছি। তখন যদি দ্রুত ব্যবস্থা হতো, হয়তো আজ সে বেঁচে থাকত। এখন আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। একই ক্যাম্পে চিকিৎসা নিয়ে মারা যাওয়া অন্য এক শিশুর মা বলেন, আমার সন্তান আর ফিরে আসবে না। কিন্তু যদি কোনো অবহেলা থেকে থাকে, তা হলে তার বিচার হওয়া দরকার। যাতে অন্য কোনো মা একই কষ্ট না পায়।

স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের মতে, কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে শুধু চিকিৎসা নয়, পুরো ব্যবস্থাপনাও পর্যালোচনা করা জরুরি। টিকাদান কর্মসূচি, রোগ শনাক্তকরণ, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালের সক্ষমতাÑ সব বিষয় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু এর দায়ভার সম্পূর্ণ অন্তর্বর্তী সরকারকে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সময়মতো টিকা না দেওয়ার কারণেই হামে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে এবং যারা শিশুদের টিকা দেয়নি, তারা এর জন্য দায়ী। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সেই কারণ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং একটি শিশু বাকি থাকতেও টিকাদান কর্মসূচি থামানো হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা মজুত রয়েছে এবং যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ শিশুদের এই টিকা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় হাম আক্রান্ত এলাকাগুলোতে কর্মরত চিকিৎসকদের সব ধরনের ছুটি এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে। দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত এক কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে যে যাই বলুক, ডেঙ্গুর মতোই হাম থেকে নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে উল্লেখ করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম মাহমুদুজ্জামান শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, করোনা, ডেঙ্গু বা অন্য কোনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে যেমন নিজেকে নিজেরই রক্ষা করা জরুরি, তেমনি হাম থেকে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে হলে নিজের সতর্কতাই এখন মুখ্য। দোষ যে কর্তৃপক্ষেরই হোক না কেন হাম তো ছড়িয়ে পড়েছে। এখন কি তা হলে আমার সন্তানকে আমি মরার জন্য ছেড়ে দেব? না এর জন্য আমার সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। বর্তমানে হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো দ্রুত টিকাদান, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত শনাক্তকরণ। হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, শিশুদের নির্ধারিত সময়ে হাম বা এমআর/এমএমআর টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করা। দুই ডোজ টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। সরকারি বিশেষ এমআর ক্যাম্পেইন চললে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে কিছুদিন আলাদা রাখতে হবে যাতে স্কুল, পরিবার বা আশপাশে সংক্রমণ না ছড়ায়। ঘনবসতিপূর্ণ স্থান বা জনসমাগমে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো, বিশেষ করে সংক্রমণ বাড়ার সময় বাড়ায় এ রকম কিছু করা যাবে না। আর কয়দিন পরই ঈদুল আজহা। সবাই নিজের শিকড়ের টানে গ্রামে যাবেন ঈদ করতে। এ সময় যাতে শিশুসন্তান কোনোভাবেই হামে সংক্রমিত না হয় সে ব্যাপারে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি অতি সংক্রামক একটি রোগ। এক বাচ্চা থেকে পুরো গ্রাম সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কোনো শিশু যদি হামে আক্রান্ত হয় তা হলে তাকে নিয়ে গ্রামে ভ্রমণ না করাই ভালো।