ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাব ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলা

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর আবারও পরিণত হলো আতঙ্ক, গোলাগুলি ও সংঘবদ্ধ শক্তি প্রদর্শনের এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে। গত রোববার মধ্যরাতে বুলডোজার চালিয়ে র‌্যাব ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া, পাহাড়ি সড়ক কেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা, সশস্ত্র অবস্থায় মহড়া এবং সংঘবদ্ধ হামলাÑ সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি এই জনপদে আধিপত্য বিস্তার করা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সুসংগঠিত শক্তি প্রদর্শন। হামলায় অংশ নেয় ২০০ থেকে ৩০০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি ছিল অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও। কয়েকজনের হাতে একে-৪৭ সদৃশ অস্ত্র দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরজুড়ে জোরদার করা হয়েছে যৌথবাহিনীর টহল। পাহাড়ি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। অভিযান চালানো হচ্ছে বিভিন্ন আস্তানা ও সন্দেহভাজনদের অবস্থানস্থলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার মধ্যরাতে সংঘবদ্ধ একটি দল জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় র‌্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হয়। একপর্যায়ে তারা বুলডোজার এনে ক্যাম্পসংলগ্ন দেয়ালে আঘাত করতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই দেয়ালের একটি অংশ ধসে পড়ে। একই সময়ে আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কেটে ফেলা হয়, যাতে অতিরিক্ত পুলিশ বা যৌথবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন। পাহাড়ি বিভিন্ন পথে গাছ ফেলে, মাটি কেটে এবং কালভার্ট ভেঙে তৈরি করা হয় প্রতিবন্ধকতা। এতে কিছু সময়ের জন্য কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীদের অনেকের মুখ কাপড়ে ঢাকা ছিল। তারা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে আসে। গভীর রাতে হঠাৎ গুলির শব্দ, চিৎকার আর বুলডোজারের বিকট আওয়াজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। অনেক পরিবার ঘরের আলো নিভিয়ে আতঙ্কে রাত কাটায়। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘মনে হচ্ছিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাইরে বের হওয়ার সাহস পাইনি। শুধু গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকার শুনেছি’। আরেকজন বলেন, ‘এখানে সাধারণ মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকে। কখন কোন গ্রুপ কার ওপর হামলা চালায়, কেউ জানে না’।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা র‌্যাব ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকলে র‌্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়। এরপরও বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে’। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় অভিযান পরিচালনায় কিছুটা সময় লাগে। একপর্যায়ে গাড়ি ফেলে হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হয় সদস্যদের।

র‌্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযানের কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ কেটে রাখা হয়েছে। ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ভেবেছিল রাস্তা কেটে দিলে আমরা ঢুকতে পারব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা তাদের প্রতিরোধ করেছি’।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। শুধু জনসমাগম নয়, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, সড়ক বিচ্ছিন্ন করা এবং আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে আগে থেকেই কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি তাৎক্ষণিক উত্তেজিত হামলা নয়। সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পনা করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে’।

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকা হিসেবে পরিচিত। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বিশাল এই জনপদে বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তার ভেতরে ঢুকলেই শুরু হয় জঙ্গল সলিমপুর। মূলত ছিন্নমূল ও আলীনগরÑ এই দুই অংশে বিভক্ত এলাকাটি। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী বাহিনী এসব জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে নতুন ঘর তুলতে, দোকান বসাতে কিংবা ছোট ব্যবসা শুরু করতেও দিতে হয় চাঁদা।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইয়াসিন বাহিনী, রোকন বাহিনীসহ কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সম্প্রতি প্রশাসনের অভিযান জোরদার হওয়ায় এসব গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক অভিযানে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে তৎপরতা বাড়ায় তাদের আর্থিক স্বার্থে আঘাত লাগে। ফলে প্রশাসনকে শক্তি দেখাতেই এই সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে।

একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনে করছেন, হামলার মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা একটি বার্তা দিতে চেয়েছেÑ এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। রোববারের ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পাহাড়ি পথ প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র হতে দেওয়া হবে না। যারা অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ভাঙচুর অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের অংশগ্রহণে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। এর আগে একাধিকবার চেষ্টা করেও পুরো এলাকা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যরা। যৌথ অভিযানের পর সরকার সেখানে পুলিশ ও র‌্যাবের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। এরই অংশ হিসেবে আলীনগরে র‌্যাব ক্যাম্প নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। রোববার রাতের হামলায় সেই ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, গত মার্চে জঙ্গল সলিমপুর অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো পলাতক রয়েছে কয়েকটি চিহ্নিত বাহিনীর শীর্ষ সদস্য। তাদের মধ্যে রয়েছে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, অভিযানের আগে ছিন্নমূল অংশ নিয়ন্ত্রণ করত রোকন বাহিনী এবং আলীনগর অংশ ছিল ইয়াসিন বাহিনীর প্রভাবাধীন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু একটি পাহাড়ি বস্তি নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাসজমি দখল, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা, স্থায়ী নজরদারি, পাহাড়ি অঞ্চলে প্রশাসনিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জঙ্গল সলিমপুর আবারও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে। আর তাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে সাধারণ মানুষই।