শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগের আবেদন করেন। চিঠিতে তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। ফলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই তিনি পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিনীত অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে পদত্যাগপত্রের একটি কপি গণমাধ্যমে শেয়ার করেন।
পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ঘিরে রাজনৈতিক চাপ : এদিকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ ঘিরে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের মাথায় তার এই আকস্মিক পদত্যাগকে কেউ শারীরিক অসুস্থতার ফল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতা।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকে মনে করছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় দলীয় চাপ এবং নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্বে আনতে না পারার হতাশা তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার কেউ কেউ রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করলেও জেলা বিএনপির সভাপতি এ ধরনের কোন্দলের কথা নাকচ করেছেন।
এই ঘটনা অনেকের কাছে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন রাঙামাটির স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানও পদত্যাগ করেছিলেন। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সরাসরি পার্বত্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া দীপেন দেওয়ানের এই পদত্যাগ নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। এতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা দেখা গেছে। তাদের প্রশ্নÑ এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে মাত্র চার মাসের মাথায় একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে হলো?
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীপেন দেওয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তিনি দলীয় কর্মকা-ে সক্রিয় ও নিবেদিত ছিলেন।
পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই চাপও দীপেন দেওয়ানকে সামলাতে হয়েছে।
অন্যদিকে, অনেকের ধারণা, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ায় দীপেন দেওয়ানের আগ্রহ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। নির্বাচনের তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠনে তেমন কোনো জটিলতা না থাকলেও রাঙামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং পারিবারিক চাপÑ সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন দীপেন দেওয়ান। অনেকের মতে, এসব কারণও তার পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তার পদত্যাগের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি’।

