রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও পরবর্তীতে নৃশংসভাবে হত্যার আলোচিত মামলায় বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। আজ মঙ্গলবার মামলার প্রথম দিনে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা ও মামলার বাদী আবদুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
এদিকে মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানিকালে এবং আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সোমবার প্রধান আসামি সোহেল রানা গণমাধ্যম ও আইনজীবীদের সামনে এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। নিজের অপরাধের দায় আংশিক স্বীকার করে সে পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ‘ডলার’ নামে একজনকে সামনে এনেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সোহেল রানার পরিকল্পিত কারসাজি হতে পারে। মামলার মোড় ঘুরাতে সে ডলার নামটি সামনে নিয়ে আসছেÑ এমনটা হতে পারে। আবার কেউ বলছেন, যেহেতু নামটি সামনে এসেছে, পুলিশ ডলার নামের ওই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই পারে। আর পুলিশ বলছে, চার্জশিট দেওয়ার পর বিষয়টি তাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক।
সোমবার সকাল পৌনে আটটায় প্রিজন ভ্যানে করে দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টার কিছু আগে সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয় পুলিশের কড়া পাহারায়। বেলা ১১টা ৬ মিনিটে আদালতে হাজির করা হয় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে।
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু শুনানিতে বলেন, পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকত সোহেল রানা। গত ১৯ মে সকালে সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে গলা কেটে মাথা আলাদা করা হয়। হাত-পা বিচ্ছিন্ন করা হয়। রামিসার মা খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে আসামিদের ঘরের সামনে মেয়ের স্যান্ডেল দেখতে পান। পরে জানালার ফাঁক দিয়ে রক্ত দেখেন। এরপর প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন তিনি। ওই বাসার বাথরুমের বালতিতে রামিসার কাটা মাথা এবং খাটের নিচে মাথাহীন দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করা হলেও সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। যাকে পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, অভিযোগপত্র অনুযায়ী আসামি সোহেল রানা নৃশংসভাবে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে শিশুটির দেহ কয়েক খ- করা হয়। এসব অপরাধে আসামিকে সহযোগিতা করে তার স্ত্রী।
পরে বিচারক অভিযোগের বিষয়ে আসামি সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসা করেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সোহেল রানা আদালতকে বলে, ‘আমি মারিনি। আমি ধর্ষণও করিনি। আমার স্ত্রীও নির্দোষ।’ সোহেল রানা দাবি করে, ডলার নামের একজন রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। সোহেলের ভাষ্য, সে শুধু রামিসাকে ‘দুই টুকরো’ করেছে। ডলারের পরিচয় জানতে চাইলে সোহেল রানা আদালতকে বলে, তার বাড়ি মিরপুর ১১ নম্বরে।
বিচারক অভিযোগ পড়ে শুনানোর সময় অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বামী সোহেলকে উদ্দেশ করে তিনি বলে, ‘তুমি বলো আমি দোষী কি না।’ এ সময় সোহেল আদালতকে বলে, ‘আমার ওয়াইফ আমাকে সাহায্য করেনি। তার কোনো দোষ নাই।’
শুনানি শেষে স্বপ্নাকে পুলিশ হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সে স্বামী সোহেলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
এদিকে শুনানি শেষে আদালত থেকে নামানোর সময় সোহেল রানা চিৎকার করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ ও খুন করেছে মিরপুর ১১ নম্বরের লাইনের ডলার। মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার আমাকে ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। আমি পাপ করছি, আমাকে শাস্তি দিন। কিন্তু মূল আসামি ওই ডলার। ওরে ধরেন আপনারা। সব পাবেন।’
সোহেল আরও দাবি করে, তদন্তকারীরা তার কোনো ডিএনএ পরীক্ষা না করেই প্রতিবেদনে তা ‘অটোমেটিক’ লিখে দিয়েছে।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, মামলাটি যেন দ্রুত শেষ হয়, সে বিষয়ে দায়িত্ব পালন করব। বাকি সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল নেবেন।
ডলার নামের ব্যক্তিটির সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ রিপোর্টে ডলারের নাম নেই। আমার কাছেও আসামিরা ডলার সম্পর্কে কিছু বলেনি।
এদিকে রামিসা হত্যা ঘটনায় নতুন করে ‘ডলার’ নামের এই ব্যক্তির নাম আসার পর স্থানীয়ভাবে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ৫ দিনের তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে চার্জশিট দাখিল করেন। ওই চার্জশিটে দুই আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বাইরে কারো নাম নেই। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আদালতে আসামির দেওয়া এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের ধারণা, সে হত্যার দায় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ডলার নামটি সামনে আনছে। কারণ আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আগে কখনো সে ডলারের নাম বলেনি। এমনকি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় এই ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দেওয়ার সময়ও সে কারো নাম বলেনি। ডলার নামের ওই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আইনের আওতায় আনা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, আমরা বিষয়টি প্রাসঙ্গিক মনে করি না। এরপরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।
শিশু রামিসার বাবা আব্দুল আহাদ মোল্লা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের প্রতিবেশী একজন ডলার আছে। সে গ্যারেজে কাজ করে। তবে তার সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আসামি কেন ডলারের নাম সামনে আনল আমি বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, আসামি হয়তো মামলা ভিন্ন খাতে নিতে এ ধরনের কথা বলতে পারে।
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প ও বালুর মাঠ বস্তিকেন্দ্রিক মাদক কারবারে ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির পরিচিতি রয়েছে। যে ওই এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী পৃথিবীর ভাই। তবে রামিসা হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল যে ডলারকে অভিযুক্ত করছে, সেই ডলার এবং এই মাদক কারবারি ডলার একই ব্যক্তি কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ।

