ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ

সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৫:২৩ এএম

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী ছিলেন। আগামী এক বছর তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘ গঠনের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার খবরে দেশ-বিদেশে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন গতকাল মঙ্গলবার  বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় (নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় সকাল ১০টায়) জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে লড়েন সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস। সদস্যভুক্ত দেশগুলোর ভোটে বাংলাদেশের প্রার্থী বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশি প্রতিনিধি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই গৌরব অর্জন করেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।

সূত্র জানায়, গতকালের নির্বাচনে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ৯৯টি দেশ বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমানকে ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকাউরিসের পক্ষে ভোট পড়েছে ৯১টি। এ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে দ্বিতীয়বারের মতো বসছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি। ৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। রাজনীতিতে যোগদানের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

এর আগে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই পদের জন্য তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে একই পদে ফিলিস্তিনের প্রার্থী থাকায় বাংলাদেশ সেই সময় কৌশলগত কারণে প্রার্থিতা স্থগিত করলেও তা প্রত্যাহার করেনি। পরবর্তীতে ফিলিস্তিন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে বাংলাদেশের প্রার্থিতা আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় মনোনয়ন দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ এ ভোটে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন। গত সোমবার পররাষ্ট্র  প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বলেছিলেন, আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশ অত্যন্ত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, এ নির্বাচনে অত্যন্ত ভালো অবস্থানে আমরা আছি। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ওনার যেহেতু একটা বিশাল অভিজ্ঞতা আছে, ক্যারিয়ার আছে জাতিসংঘে। সুতরাং আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে বাংলাদেশ জয়যুক্ত হবে এবং আমি মনে করি, অনেক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বাংলাদেশের জন্য; বাংলাদেশের মানুষের জন্য। এটা একটা গর্বের মুহূর্ত হবে বাংলাদেশের জন্য।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের প্রধান ৬টি শাখার মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিকভাবে এটি সাধারণ পরিষদ নামে পরিচিত। এটিই একমাত্র পরিষদ যেখান জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সব রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও প্রতিনিধিত্বের অধিকারী হিসেবে অবস্থান করে। সাধারণ পরিষদ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে, ইয়াসির আরাফাতের শুনানির জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নেশনস প্রাসাদে সাধারণ পরিষদ তাদের ২৯তম অধিবেশনের আয়োজন করে। জাতিসংঘ সনদের ৯নং অনুচ্ছেদ থেকে ২২নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিষয়াবলির আলোকে সাধারণ পরিষদের গঠন, ক্ষমতা, কার্যাবলি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত হয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রই ৫ জন স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী প্রতিনিধি সভায় প্রেরণ করতে পারে। কিন্তু সদস্য দেশগুলোর প্রত্যেকেই সভায় উত্থাপিত কোনো বিষয়ের ওপর কেবল একটিমাত্র ভোট প্রয়োগ করতে পারে। সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের বার্ষিক আয়-ব্যয় বা বাজেট অনুমোদন করে। এ ছাড়াও, প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘ পরিচালনার জন্য কতটুকু অর্থ প্রদান করবে তারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ৩য় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। সাধারণত ডিসেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত এ অধিবেশন স্থায়ী হয়। প্রয়োজনবোধে একাধিকবারও অধিবেশন বসতে পারে। প্রত্যেক অধিবেশনের শুরুতে অধিকাংশ সদস্যের ভোটে একজন সভাপতি বার্ষিকভিত্তিতে নিযুক্ত হন। অতঃপর তার মাধ্যমেই সভার কর্মসূচি গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে যে-কোনোরূপ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রধান এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক অধিবেশন ও বিতর্কের সভাপতিত্বকারী। প্রতি বছর জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সদস্য দেশগুলোর ভোটে সাধারণ পরিষদের সভাপতি এক বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সভাপতি  সভার কার্যপ্রণালী পরিচালনা, আলোচনা অনুষ্ঠান এবং সাধারণ পরিষদের নিয়মের অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। সভাপতি মূলত সভার কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনার কাজটি সমন্বয় করেন; তবে তিনি নিজে সাধারণ পরিষদের কোনো সিদ্ধান্তে সরাসরি ভোট প্রদান করেন না। ভৌগোলিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘের পাঁচটি অঞ্চল আফ্রিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয়, পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চল বা দেশ থেকে  থেকে পালাক্রমে সভাপতি নির্বাচিত করার নিয়ম রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন।

ড. খলিলুর রহমানের পরিচিতি : ড. খলিলুর রহমান একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. খলিলুর রহমান ১৯৫৪ সালের ১ এপ্রিল ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাইলাইল ইউনিয়নের পাড়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৮০-৮৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন এবং তার কর্মজীবনের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।

ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনার প্রধান রচয়িতা ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মসূচি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। ড. খলিলুর রহমান ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এ ছাড়া তিনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড. খলিলুর রহমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকারের রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলির জন্য প্রধান উপদেষ্টার হাইরিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি উপদেষ্টার মর্যাদা এবং সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। এপ্রিলের ৯ তারিখে তাকে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়। খলিলুর রহমানকে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্রেট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।