রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সি স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এক দিনেই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে রামিসা হত্যাকা-ের বিভীষিকাময় ঘটনা। আজ বুধবার দুই আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, রামিসা হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আসামিদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বুধবার (আজ) দিন ধার্য করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন একই আদালত।
গতকাল মঙ্গলবার আদালতে সাক্ষ্য দেন রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, স্বজন, প্রতিবেশী, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য সাক্ষীরা। শুনানিকালে কড়া নিরাপত্তায় দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রামিসার মা পারভীন আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আদালতকে বলেন, আমি তাকে (স্বপ্না) অনেকবার বলেছি, বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না। কিন্তু সে দরজা খোলেনি। তিনি জানান, মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে আসামিদের (সোহেল-স্বপ্না) ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পরও সাড়া না মেলায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভাঙা হয়। ভেতরে ঢুকে রক্তাক্ত দৃশ্য দেখতে পান তারা। পরে শোবার ঘরে মেয়ের মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের একটি বালতিতে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান।
সাক্ষ্য দিতে গিয়ে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। তিনি আদালতকে জানান, স্ত্রীর ফোন পেয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে দরজা ভাঙার কাজে অংশ নেন। পরে ঘরের ভেতরে মেয়ের মরদেহ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার দিন সকালে সোহেল রানার ফ্ল্যাট থেকে অস্বাভাবিক শব্দ শুনেছিলেন তারা। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর রক্তাক্ত পরিবেশ দেখতে পান। একই ভবনের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, দরজা ভাঙার পর ভেতরে রক্ত দেখতে পান। পরে একটি কক্ষে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু জানান, আসামি স্বপ্নাকে জিজ্ঞাসা করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। পরে খাটের নিচে মরদেহ এবং একটি বালতির মধ্যে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা। আরেক প্রতিবেশী শেখ আবু সামা আদালতে বলেন, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি জানালা দিয়ে এক ব্যক্তিকে নিচে নামতে দেখেছিলেন। পরে সংবাদমাধ্যমে ছবি দেখে নিশ্চিত হন, ওই ব্যক্তি আসামি সোহেল রানা।
এদিকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কেঁদেছেন পুলিশের এসআই ইকবাল হোসেন। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি কান্না করতে থাকেন। তিনি জব্দ তালিকা ও সুরতহাল প্রস্তুত করেছেন। এসআই ইকবাল হোসেন বলেন, রামিসার হাতও কাটার চেষ্টা করা হয়। সামান্য চামড়া লেগে ছিল। তাই দ্বিখ-িত হয়নি। আদালতে রামিসার ব্যবহৃত কাপড় ও জুতা উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যায় ব্যবহৃত চাকু, যে বালতিতে রামিসার মাথা রাখা হয়েছে সেগুলোও উপস্থাপন করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার বাসা থেকে বের হলে রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় সোহেল ও স্বপ্না। পরে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, হত্যার পর মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে মরদেহ খাটের নিচে এবং মাথা বাথরুমের একটি বালতিতে রেখে দেওয়া হয়। ঘটনার পর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান সোহেল রানা। বাসার ভেতরেই অবস্থান করছিলেন স্বপ্না আক্তার।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সোহেল রানাকে। তদন্ত চলাকালে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দেন তিনি।
মামলার তদন্ত শেষে গত ২৪ মে পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সাক্ষীদের বক্তব্যে ঘটনার ভয়াবহতা ও আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আদালত ধারাবাহিকভাবে শুনানি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকারের দায়িত্ব হলো তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে। তবে রায় দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আজ বুধবার আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য করবেন আদালত।
আসামির বক্তব্য প্রচার না করতে কড়া নির্দেশনা আদালতের : শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ হেফাজতে ও আদালতের বাইরে থাকা অবস্থায় আসামির কথা বলা ও তা প্রচার না করার নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এই আদেশ দেন। এদিন মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগে আদালতের বাইরে আসামির বক্তব্য দেওয়া ও তা প্রচার বন্ধে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি আদালতকে বলেন, আইন অনুযায়ী বিচারকের সামনে ব্যতীত পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় কথা বলার এখতিয়ার আসামির নেই। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা বা দ-িত আসামিদের বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার করা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়মানুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা, জনমত প্রভাবিত হওয়া রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে তিনি ভবিষ্যতে আসামিদের জনসমক্ষে বক্তব্য প্রদান বন্ধে পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন। পরে আদালত আবেদন মঞ্জুর করে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

