× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

অপরাধের দুর্গ হচ্ছে সম্ভাবনার জনপদ

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

একসময় জঙ্গল সলিমপুরের নাম শুনলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত চট্টগ্রামজুড়ে। পাহাড়ঘেরা এই জনপদ যেন ছিল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক অঘোষিত এলাকা। দিনের আলোতেও যেখানে মানুষ চলাফেরা করতেন শঙ্কা নিয়ে। আর রাত নামলেই আধিপত্য বিস্তার করত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

বছরের পর বছর ধরে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। কিন্তু সেই চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়ে এলাকাটিকে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার জনপদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতা এবং বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার ফলে ভেঙেছে ইয়াসিন-রোকন বাহিনীর দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব।

চট্টগ্রাম মহানগরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়ক ধরে এগোলেই চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়ের বিস্তৃত সারি। দূর থেকে এটি নিসর্গময় এক শান্ত জনপদ মনে হলেও সেই সৌন্দর্যের আড়ালে বহু বছর ধরে চলেছে অবৈধ জমিবাণিজ্য, পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে। আশির দশকের শেষ দিকে এখানে ছিন্নমূল মানুষের বসতি গড়ে উঠলেও ধীরে ধীরে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্রের হাতে। পাহাড় কেটে প্লট তৈরি, অবৈধভাবে জমি বিক্রি, নতুন বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও দখল-বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় জঙ্গল সলিমপুরে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। সেখানে ইতোমধ্যে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সলিমপুরের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে। আগে অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়ন করা যায়নি এমন কিছু সরকারি স্থাপনাও এখন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জেলা কারাগার, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা স্থাপনের আবেদন নিয়েও কাজ চলছে। মানুষের সুবিধার্থে একটি ভূমি অফিস স্থাপন করা হয়েছে, যাতে জমিসংক্রান্ত সিন্ডিকেট বন্ধ করা যায়। খুব শিগগির এর কার্যক্রম শুরু হবে। পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত মানুষকে আইনানুগ কাঠামোর মধ্যে পুনর্বাসনের বিষয়েও কাজ চলছে।

সূত্র জানায়, ২০২২ সাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, স্পোর্টস ভিলেজ এবং ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের কারণে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন সরকার এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে।

স্থানীয়দের ভাষায়, জঙ্গল সলিমপুরে দলিলের চেয়ে বেশি মূল্য ছিল সন্ত্রাসীদের কথার। যার শক্তি বেশি, জমির মালিকও যেন সে-ই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর মূলত দুই প্রভাবশালী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। আলীনগর অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন ইয়াসিন আর ছিন্নমূল এলাকার বড় অংশ ছিল রোকনের প্রভাববলয়ে। দুই পক্ষেরই রয়েছে নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী।

জানা গেছে, নতুন কেউ পাহাড়ে বসতি স্থাপন করতে চাইলে কিংবা ঘর নির্মাণ করতে গেলেও তাদের অনুমতি নিতে হতো। চাঁদা না দিলে অনেক ক্ষেত্রেই বসবাস শুরু করা সম্ভব ছিল না। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে অনানুষ্ঠানিক চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি চালানো হতো। অপরিচিত কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। এমনকি প্রশাসনের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং কথিত টর্চার সেল পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ফলে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর এক অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেছে।

গত এক যুগে জঙ্গল সলিমপুরে বহু অভিযান চালানো হলেও প্রতিবারই অভিযান শেষে সন্ত্রাসীরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে ফিরে আসে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এর প্রধান কারণ ছিল এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা।

পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় ছিল সন্ত্রাসীদের নিজস্ব নজরদারি পয়েন্ট। দূর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহন দেখামাত্রই খবর পৌঁছে যেত পাহাড়ের গভীরে। ফলে অভিযানের আগেই তারা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারত। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবেও ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান সরকার জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করে। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় বৃহৎ পরিসরের অভিযান। ড্রোন নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে একের পর এক সন্ত্রাসী আস্তানায় আঘাত হানা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অভিযানের ফলে দীর্ঘদিনের অপরাধচক্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, উচ্ছেদ করা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা এবং এলাকায় প্রশাসনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য উন্নয়নকে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বার্তা এসেছে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বায়েজিদ লিংক রোড থেকে আলীনগর, আলীনগর থেকে উত্তরে হাটহাজারী লিংক রোড এবং জলিল টেক্সটাইল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকেই সেনাবাহিনী সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এসব সড়ক নির্মিত হলে পুরো এলাকার চিত্র বদলে যাবে এবং উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে যাবে।

এসপি মাসুদ বলেন, অনেকেই ইয়াসিনের কাছ থেকে প্লট কিনে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে কিছু আশঙ্কা রয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সরকার কাউকে উচ্ছেদ করতে আসেনি। উন্নয়নের প্রয়োজনে কোথাও জমি প্রয়োজন হলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেই কাজ করা হবে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আর সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালাতে দেওয়া হবে না। যারা বছরের পর বছর মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

হামলা, গুলিবিনিময় ও নতুন বাস্তবতা

চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় র‌্যাব-৭-এর একটি দল। এ সময় র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া প্রাণ হারান। এ ছাড়া তিনজনকে জিম্মি করে মারধর করা হয়। এরপর গত ৯ মার্চ হেলিকপ্টার, ড্রোন ও সাঁজোয়া যানসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির ৩ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নেন জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অভিযানে। ওই অভিযানের সময় ইয়াসিন, রোকনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।

এদিকে গত ২৪ মে গভীর রাতে ২০০ থেকে ৩০০ সন্ত্রাসী নির্মাণাধীন র‌্যাব ক্যাম্পে হামলা চালায়। রাস্তা কেটে দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় ক্যাম্প। এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ। এরপর থেকেই র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকাটি অনেকটাই শান্ত রয়েছে।

গত ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করেন। তিনি ঘোষণা দেন, সন্ত্রাসীদের শেষ আশ্রয়স্থলটিও নির্মূল করা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে বসবাসকারী মানুষদের আশ্বস্ত করে বলেন, পুনর্বাসনের আগে কোনো উচ্ছেদ করা হবে না। তিনি আরও জানান, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কারাগার, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার নিরপরাধ ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছে। সলিমপুরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করছে সরকার।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরের স্থায়ী সমাধান কেবল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নয়। অবৈধ জমি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারির অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিতে হবে। অন্যথায় নতুন কোনো গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পাহাড়ে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বৈধ আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনাই অনেক সময় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে আতঙ্কের জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। ঘুরতে শুরু হয়েছে উন্নয়নের চাকা। আর সেই সঙ্গে ভাঙতে শুরু করেছে ইয়াসিন-রোকনের দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্য। জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু অতীতের অন্ধকারের গল্প নয়, বরং একটি নতুন সম্ভাবনার নাম।

Link copied!