ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ

মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৫:১৮ এএম

পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিভিন্ন অঙ্গীকার করা হয় আজকের এই দিনে। পরিবেশ দিবস উদযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’-এর আলোকে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব আবারও বিশ্বব্যাপী বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বনভূমি এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরনই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। বিশ্বের এক প্রান্তে দাবানল, অন্য প্রান্তে ভয়াবহ বন্যা, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রকৃতি আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, তার সহনশীলতারও একটা সীমা রয়েছে। বহু দশক ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নির্বিচারে বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের লাগামহীন হস্তক্ষেপ আজকের এই সংকটকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েই চলেছে। উপকূলে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিস্তার, উত্তরাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং শহরাঞ্চলে পরিবেশগত অবক্ষয়ের পাশাপাশি যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিপর্যয়। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

দেশের প্রেক্ষাপটে সুন্দরবন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার, যার মধ্যে রয়েছে প্রতীকী ও বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য জলজ ও স্থলজ প্রাণী, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং লাখ লাখ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণের কারণে এই বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে রয়েছে।

প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার : এ বছরের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি প্রকৃতিভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ। ম্যানগ্রোভ বন অত্যন্ত কার্যকর প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান হিসেবে কাজ করে, যা একদিকে কার্বন নিঃসারণ কমাতে সহায়তা করে এবং অন্যদিকে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ায়। এগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্লু কার্বন সংরক্ষণ করে, উপকূলীয় ভূমি স্থিতিশীল রাখে, ক্ষয়রোধ করে এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে।

সুন্দরবন পুনরুদ্ধারকে তাই জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান এবং প্যারিস চুক্তির আওতায় বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক অভিযোজন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কৌশলগত জলবায়ু বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও পরিবেশগত অখ-তা নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পুনরুদ্ধার পদ্ধতি অপরিহার্য।

ব্লু কার্বন : জলবায়ু ও অর্থায়নের সুযোগ : সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে ব্লু কার্বন-ব্যবস্থার মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়নে রূপান্তরের উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তিশালী পরিমাপ, প্রতিবেদন ও যাচাইকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বেচ্ছা কার্বন বাজার এবং প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬-এর অধীনে ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন অর্জন করতে পারে। সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম থেকে উৎপন্ন কার্বন ক্রেডিট পুনরায় বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যেতে পারে, যা প্রকৃতি, জলবায়ু কর্মসূচি এবং টেকসই উন্নয়নের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিভিত্তিক জলবায়ু সমাধানসমূহ পরিবেশগত ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ সহ-সুবিধা প্রদান করেÑ ইন্দোনেশিয়া ব্লু কার্বন অর্থায়ন ও উপকূলীয় জীবিকা উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার সম্প্রসারণ করেছে। ভিয়েতনাম জাতীয় উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশলে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেনিয়া সম্প্রদায়ভিত্তিক ম্যানগ্রোভ কার্বন প্রকল্পের মাধ্যমে যাচাইকৃত কার্বন ক্রেডিট ও ন্যায্য সুবিধা বণ্টনব্যবস্থা উন্নয়ন করেছে। কোস্টারিকা ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস পেমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে বন সংরক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অর্থায়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে সমন্বিত করেছে।

এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে কার্যকর বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি অংশগ্রহণ, বিশ্বাসযোগ্য কার্বন হিসাবব্যবস্থা এবং টেকসই অর্থায়ন কাঠামো।

বাংলাদেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার : ম্যানগ্রোভকে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য কৌশলের সঙ্গে সংহত করে জাতীয় ব্লু কার্বন কাঠামো প্রণয়ন। বৈশ্বিক মানদ- অনুযায়ী উপকূলীয় জলাভূমির কার্বন হিসাবের জন্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ। অবক্ষয়িত ম্যানগ্রোভ ও বাফার জোনে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্প্রসারণ। কমিউনিটি কো-ম্যানেজমেন্ট ও ন্যায্য সুবিধা বণ্টনব্যবস্থা জোরদার। আর্টিকেল ৬ ও স্বেচ্ছা কার্বন বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি। সুন্দরবনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা জোরদার। বাস্তুতন্ত্রের অখ-তা রক্ষায় পর্যবেক্ষণ, প্রয়োগ ও সম্মতি ব্যবস্থা উন্নয়ন।

‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, জলবায়ুর জন্য; আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’Ñএই প্রতিপাদ্যের আলোকে সুন্দরবন দেখায় যে কীভাবে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান টেকসই উন্নয়নের পথকে রূপ দিতে পারে। এর সংরক্ষণ জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো কনভেনশন, প্যারিস চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর অধীনে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুন্দরবন রক্ষা মানে হলো প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জলবায়ু স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত সহনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

লেখক : অতিরিক্ত সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়