ঢাকা রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্প

জমিজটে থমকে গেছে ১৭ কোটির মেগা প্রজেক্ট

সালমান ফরিদ, সিলেট
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৫:২৯ এএম

আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা, উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর এবং প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পটিকে। তবে সরকারের অন্যতম এই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্পের গতি এখন অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে জমি অধিগ্রহণ (ভূমি অধিগ্রহণ)-সংক্রান্ত নানামুখী জটিলতায়। বিশেষ করে সিলেট এবং হবিগঞ্জ অংশে জমি হস্তান্তরের চিত্র এতটাই হতাশাজনক যে, তা পুরো প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ও প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি ও মাঠপর্যায়ের সূত্র জানায়, মহাসড়কের প্রশস্ততা বাড়াতে প্রায় এক হাজার ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু প্রকল্প শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জমির দখল বুঝে পেয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। সিলেট ও হবিগঞ্জ অঞ্চলের প্রশাসনিক সীমানায় এই স্থবিরতা সবচেয়ে তীব্র। সিলেটে নির্ধারিত ২৫৪ দশমিক ৯৫ একর জমির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৮ দশমিক ৫৬ একর জমি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, এখনো প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি জমি হস্তান্তরের অপেক্ষায় ‘লাল ফিতা’য় আটকে আছে।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের ধীরগতির নেপথ্যে রয়েছে মূলত বারবার নকশা পরিবর্তন ও অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কড়া শর্ত। ২০১৮ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) যখন তৈরি হয়, তখন জমি অধিগ্রহণের একটি প্রাথমিক নকশা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এডিবি এই প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখার স্বার্থে মূল নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেয়।

আগের নকশায় মহাসড়কের দুপাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য নির্ধারিত ‘সার্ভিস লেন’-এর প্রশস্ততা ছিল ৩ দশমিক ৬ মিটার। কিন্তু এডিবির নিরাপত্তা ও কারিগরি শর্ত অনুযায়ী তা বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ মিটার করা হয়। নকশায় এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অতিরিক্ত জমি, বসতভিটা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা অধিগ্রহণের আওতায় চলে আসে। নতুন করে জমি জরিপ (সার্ভে), যৌথ তদন্ত এবং ৩ ধারা ও ৪ ধারার নোটিশ জারির পুরো প্রক্রিয়াটি স্ক্র্যাচ বা শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। ফলে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রূপ নেয়।

এই প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের অসংখ্য অভিযোগ ও ক্ষোভের চিত্র ফুটে উঠেছে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্থানীয় পেজগুলোতে। এ নিয়ে অনুসন্ধানে ক্ষতিপূরণ বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের জরিপে দুটি বড় ধরনের অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের কিছু কিছু এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত গেজেট বা নোটিশ প্রকাশের ঠিক আগে সওজ ও ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে রাতের আঁধারে মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী বা নামমাত্র টিনের চালা, সস্তা দোকানঘর বা কৃত্রিম বাগান তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্যÑ এগুলোকে ‘মূল্যবান স্থাপনা’ হিসেবে দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ পকেটে ঢোকানো। ফলে প্রকৃত বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থে ফাইল আটকে থাকছে।

অন্যদিকে, বংশানুক্রমে বসবাসকারী প্রকৃত ভূমি মালিকরা অভিযোগ করেনÑ সরকারি রেট (মৌজা দর) অনুযায়ী জমির যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম। তার ওপর জমির খতিয়ানে সামান্য নামের ভুল বা অংশীদারিত্বের বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে ঘোরানো হচ্ছে। অনেকে এখনো ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ভাঙার নোটিশ পেলেও ক্ষতিপূরণের টাকা বা এলএ কেসের চেকে সই পাননি। ফলে তারা জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন এবং অনেক স্থানে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

সূত্র জানায়, ভূমি হস্তান্তর না হওয়ার চেন-অব-ইফেক্ট বা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিয়েছে ইউটিলিটি শিফটিং (সেবামূলক লাইন অপসারণ)-এর সংকট। মহাসড়কের দুপাশে থাকা হাজার হাজার বৈদ্যুতিক খুঁটি (পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবি), তিতাস গ্যাসের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন, বিটিসিএলের টেলিফোন তার, ওপিজিসিএল এবং ওয়াসার পানির লাইন স্থানান্তরের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তা করা যাচ্ছে না। যেহেতু নতুন জমি এখনো সওজের নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তাই সেবা সংস্থাগুলো তাদের লাইন সরিয়ে ঠিক কোথায় স্থাপন করবে, সেই জায়গা পাচ্ছে না। ফলে রাস্তার একপাশে মাটি কাটার কাজ হলেও অন্যপাশে গ্যাস বা বিদ্যুতের লাইনের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারছেন না ঠিকাদাররা।

সরকারি তথ্যমতে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (এন-২) প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ২০৯ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথকে মোট ১৩টি প্যাকেজে বা লটে ভাগ করে দেশি-বিদেশি বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জমি সংকটের কারণে প্যাকেজগুলোর অগ্রগতি মোটেও সুষম নয়। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই অর্থায়নের উৎস হলো এডিবি (ঋণ) এবং বাংলাদেশ সরকার (নিজস্ব তহবিল)। প্রকল্পে সিলেট জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৪ দশমিক ৯৫ একর। তবে সিলেটে এ পর্যন্ত হস্তান্তরিত ভূমির পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৫৬ একর, যা মোট প্রকল্পের মাত্র ১৯.০৪ শতাংশ। আর হবিগঞ্জ জেলায় লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৫ শতাংশ জমি এখনো আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। এর আগে ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে ২০২৭ সাল করা হয়। তবে সেটিও রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্মাণকাজের চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মূল সড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল যেখানে সরকারি খালি জায়গা, পুরোনো রাস্তার অংশ বা খাস জমি রয়েছেÑ সেসব অংশেই মাটি কাটা, কালভার্ট নির্মাণ ও ড্রেনেজ লাইনের কাজ করতে পারছে। যেখানেই ব্যক্তিগত জমি বা বাজার এলাকা পড়ছে, সেখানেই কাজ থমকে আছে। ফলে ২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ হওয়া অবধারিতভাবে অসম্ভব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ আরও বৃদ্ধি পাবেÑ এটা প্রায় নিশ্চিত।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন জানান, মহাসড়কটির নির্মাণকাজ আংশিক ও ধীরগতিতে চলায় এই রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি এখন চরমে। শুষ্ক মৌসুমে পুরো মহাসড়ক ধুলোবালিতে অন্ধকার হয়ে থাকে, ফলে সামনের গাড়ি দেখা যায় না এবং প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। আবার বর্ষা মৌসুমে আধভাঙা রাস্তা ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সৃষ্টি হয় বিশাল বিশাল গর্ত, যা দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি করে।

সিলেটের ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মতে, এই মহাসড়কটি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি সিলেটের পাথর কোয়ারি, চা-শিল্প এবং তামাবিল স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান রুট। কিন্তু বেহাল সড়কে ধীরগতির কারণে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা ব্যাপক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর প্রধান দুর্বলতাই হলো জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করে মূল সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়া। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে না পেরে অলস বসে থাকে এবং চুক্তি অনুযায়ী সরকারের কাছে ‘আইডল ইকুইপমেন্ট’ ও ‘টাইম এক্সটেনশন’-এর নামে অতিরিক্ত ক্লেইম বা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এতে শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের করের টাকাই অপচয় হয়। এই স্থবিরতা কাটাতে সিলেট এবং হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। প্রতিটি মৌজার জন্য আলাদা ‘উন্মুক্ত গণশুনানি’র আয়োজন করে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। প্রকৃত জমির মালিকদের সরাসরি স্পট-পেমেন্ট বা দ্রুত চেকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জমি ছেড়ে দেন।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ (ভূমি অধিগ্রহণ) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সওজের সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘সিলেট ও হবিগঞ্জের বেশ কিছু অংশে এখনো ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। জটিলতার কারণে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করতে আমরা সময় আরও দুই বছর (২০২৭ সাল পর্যন্ত) বাড়িয়ে নিয়েছি। তবে এখন আগের চেয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভূমি অধিগ্রহণের নথিপত্র দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্পের সিলেট অংশের প্রজেক্ট ম্যানেজার দেবাশীষ রায় জমি হস্তান্তর ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে বলেন, ‘সিলেট অংশে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছুটা জটিলতা ছিল, যার কারণে প্রাথমিক অগ্রগতি কম। তবে নতুন জেলা প্রশাসক আসার পর তিনি নিজে সাইট ভিজিট করে যেসব জায়গায় স্থাপনাজনিত ঝামেলা নেই, সেগুলো আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন। জমি বুঝে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি অনেক বৃদ্ধি পাবে।’

সিলেট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট অংশের ১৭টি ক্যাটাগরির (এলএ কেস) ফাইলের মাঝে ১১টি ইতোমধ্যেই ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়ে চলে এসেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই অনুমোদনের ফলে ঢাকা-সিলেট অংশের জমি অধিগ্রহণের বড় জটিলতা কেটে যাচ্ছে।’