ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে কর্মসংস্থান

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৪:৫৩ এএম

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা ও নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে করনীতিও করছে সরকার। নতুন সরকারে লক্ষ্য কর বাড়ানো নয় বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ।

সরকারেল লক্ষ্য বিনিয়োগে গতি আনা, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং একটি নায্যতাভিত্তিক, আধুনিক, স্বচ্ছ ও অটোমেটেড কর-ব্যবস্থা চালু করা, যে কারণে আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব করা হবে। আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) পরিকল্পনা ও  অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরবেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং থেকে আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব থাকছে। সব ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয়কে করমুক্ত, স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স জিরো করার প্রস্তাব করা হবে।

আগামী বাজেটে এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার থেকে অর্জিত আয় করমুক্তের প্রস্তাব করা হচ্ছে। সাধারণদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ করার প্রস্তাব থাকছে।

একই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়াক্ষেত্রের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব থাকছে। সঠিক করনীতি প্রণীত হলে উদ্যোগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে বিশ^াস করে সরকার।

পরিবেশের সুরক্ষা এবং জ¦ালানি তেল আমদানির চাপ কমাতে ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে নতুন নীতিমালা আনছে এনবিআর। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে। তবে নতুন সরকারের লক্ষ্য কর বাড়ানো নয়, বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ।

কর রেয়াত সুবিধা কোন খাতে : প্রস্তাবিত আগামী বাজেটে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহারের প্রস্তাব থাকছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা দিতে পারে সরকার।

সব ধরনের ইলেকট্রিক গাড়ি বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের পরিমাণ ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ইলেক্ট্রিক গাড়ির ২০০, ৩০০, ৪০০ এবং ৪০০ কেডব্লিউর বেশি ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও ১ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব থাকছে। সৌরবিদ্যুৎ ও ইলেক্ট্রিক গাড়ির ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়লে বিদেশ থেকে জ¦ালানি তেল আমদানির চাপ কমবে।

এনবিআর জানায়, রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের মানবিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে করদাতাদের দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে দান করাকে উৎসাহ দিতে কর রেয়াত দেওয়া হবে; যার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী সেবা, ক্যানসার, অটিজম, ডায়াবেটিস, থ্যালাসেমিয়া ও সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত ১১টি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

উৎসে কর কর্তনের হার ও প্রস্তাব : বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছে থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর উৎসে কর কর্তনের হার গত বছর ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। এ বছর উৎসে করের হার ৩ শতাংশে কমিয়ে আনাই উদ্দেশ্য। রপ্তানি আয় থেকে প্রাপ্ত নগদ প্রণোদনার ওপর উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা; রিফাইনারি কর্তৃক জ¦ালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা; রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালে করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হবে।

এনবিআর জানায়, বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার; মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা; প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা; পরিবহন, ক্যারিং ও গাড়ি ভাড়া সেবা খাতে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হবে।

শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা করা হবে। যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধ খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা; অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বিমা প্রিমিয়াম থেকে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা; অনিবাসীকে পরিশোধিত সুদের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে।

এনবিআরের পদক্ষেপগুলো ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াবে, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে, উৎপাদন ব্যয় কমাবে। ফলস্বরূপ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে।

উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা : এত দিন করযোগ্য বা কম আয় থাকা সত্ত্বেও উৎসে কর্তিত কর বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা ব্যবসায় পুঁজির সংকট তৈরি করত। আমাদের সরকার এই বিধান বাতিল করে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার আন্তর্জাতিক বিধান চালু করছে। অতিরিক্ত পরিশোধিত উৎসে কর ফেরত দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দেশীয় ব্যবসার সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে।

খাদ্য নিরাপত্তা : দেশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশীয় তেলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদন ব্যবসার করহার আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষি খাতে বিনিয়োগ ও দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়বে।

নবায়নযোগ্য জ¦ালানি : বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হয় না, উৎপাদন বাড়ে না, অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। তাই এবারের বাজেটে করপোরেট কর পরিপালনব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজাল থেকে করদাতাদের রেহাই দেওয়া, ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়িয়ে এবং উৎসে কর কর্তন না করার কারণে খরচ অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান বিধান বিলোপের মাধ্যমে করদাতার কার্যকর করভার কমানো হবে। অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচন এবং উৎসে কর যাচাইয়ের জন্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

করপোরেট করহার : নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট হারে করারোপের নিশ্চয়তা প্রদানে বিদ্যমান করপোরেট করহার আগামী করবছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হবে। তবে, আগামী দিনগুলোতে করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে কাক্সিক্ষত পরিমাণ কর আদায় করা গেলে সরকার যেসব সেক্টরে বিদ্যমান করহার কিছুটা বেশি রয়েছে, তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকবে।

কৃষিপণ্যে আয়করে ছাড় প্রদান : মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমনÑ ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হবে। ফলে দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি কমবে এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্য খাতে করছাড় : কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ হবে। এতে কিডনি রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ প্রায় ৬০০ টাকা কমবে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।

স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহ : উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা; পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ইলেক্ট্রিক চার্জিং স্টেশন, ইলেক্ট্রিক বাস ও ইলেক্ট্রিক ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশের প্রস্তাব করা হবে।

কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ করা; স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ/২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে।

এনবিআর জানায়, করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব থাকছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগৃহিত অগ্রিম করের পরিমাণ হবে অতি নগণ্য। প্রতি ১ হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা। তাছাড়া, অগ্রিম সংগৃহীত এ আয়কর করদাতার প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় হবে।

আরও জানা গেছে, ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করার বিধানের প্রস্তাব থাকছে। তবে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট, নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট ও বোর্ড কর্তৃক গেজেট দ্বারা টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি আওতার বাইরে থাকবে। এছাড়া অন্য যেকোনো ব্যক্তির জন্য টিআইএন সনদ দাখিলের বিধান থাকছে।

সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং, ইউটিলিটি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। উইথহোল্ডারস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর প্রবর্তন করে উৎসে কর-ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রস্তাব থাকছে।

মোটরসাইকেলে নিবন্ধন : ১৫০ সিসি ও তদূর্ধ্ব সিসির মোটরসাইকেলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থাকছে। তবে মোটরসাইকেল মালিককে রেজিস্ট্রেশন অথবা রেজিস্ট্রেশন নবায়ন করতে কোনো কর পরিশোধ করতে হবে না।

সেরা করদাতা সম্মাননা পুরস্কার প্রদান : করদাতাদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিকভাবে সম্মানিত করা ও সবাইকে কর প্রদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালার ভিত্তিতে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ২২টিসহ মোট ৬৭ জন করদাতাকে সেরা করদাতার পুরস্কার দেওয়া হবে বলে প্রস্তাবে থাকছে।