ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত ও রোগী স্থানান্তরের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পর থেকেই হাসপাতালটিতে চরম অনিশ্চয়তা ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই ভর্তি থাকা রোগীরা হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে, তখন হাসপাতালটিতে মোট ৪২৬ জন রোগী ভর্তি ছিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল পর্যন্ত ছাড়পত্র নিয়ে ১৭৬ জনের মতো রোগী চলে গেছে। বর্তমানে ২৪৩ থেকে ২৫০ জনের মতো রোগী সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না এবং বহির্বিভাগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসা না পেয়ে অনেককে ফিরে যেতে দেখা গেছে।
রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা : হঠাৎ হাসপাতাল বন্ধের এই সিদ্ধান্তে ভর্তি থাকা রোগী, তাদের স্বজন এবং হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে। হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সাত দিন ধরে চিকিৎসাধীন চার বছরের শিশুর বাবা মোহাম্মদ তুহিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অপরাধ করছে, সরকার বন্ধ করবে ঠিক আছে। কিন্তু হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের পর আমরা এখন কোথায় যাব?’ সাতক্ষীরা থেকে আসা বি এম রাসেল জানান, তার স্ত্রীর ফ্যাটি লিভারসহ কিছু জটিলতার কারণে চার দিন এখানে ছিলেন। আজ রিলিজ দিলেও সামনে ফলোআপ চিকিৎসার জন্য এই ডাক্তারকে কীভাবে পাবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে আসা মোকসেদ আলী জানান, তার স্ত্রীর সোমবার সিজার হয়েছে। চিকিৎসকেরা আরও কয়েক দিন থাকার কথা বললেও গত রাতে মোটামুটি সুস্থ দাবি করে বাসায় নিয়ে যেতে বলেছেন। ঢাকার বাংলামোটরের বাসিন্দা সুমন বিশ্বাস সন্তানের চিকিৎসার জন্য এসে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকায় অন্য হাসপাতালে যান।
এদিকে তীব্র জটিলতা তৈরি হয়েছে আইসিইউ, এনআইসিইউ, এইচডিইউ ও সিসিইউতে থাকা সংকটাপন্ন রোগীদের নিয়ে। গত বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, এনআইসিইউতে ৬০ জন নবজাতক, আইসিইউতে ২০ জন এবং সিসিইউতে ৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। মধুবাগের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ জানান, চার দিন আগে সিজারের পর তার সন্তান বর্তমানে এনআইসিইউতে রয়েছে। এ অবস্থায় বাচ্চাকে অন্য কোথাও নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ছয় শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি হোক, পুরো হাসপাতালের হায়ার বডি থেকে নার্স পর্যন্ত পরিবর্তন করা হোক, কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ করা ঠিক নয়।’ গাজীপুরের আসমা ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেলিনা বেগমও তাদের অসুস্থ শিশুদের নিয়ে এই মুহূর্তে অন্য হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
নার্স ও কর্মচারীদের অনিশ্চয়তা এবং উত্তেজনা : লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে চাকরি হারানোর শঙ্কায় ক্ষুব্ধ হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীরা। ‘হাসপাতাল বন্ধ হলে আমাদের চাকরির ব্যবস্থা কে করবে’ Ñএই প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। গতকাল দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরও চড়াও হন হাসপাতালের কিছু কর্মী। এরপর একটি টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, অপেক্ষাকৃত কম জটিল রোগীদের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে, তবে আইসিইউ বা পোস্ট-অপারেটিভ রোগীদের সরাতে সময় লাগছে।
‘আমরা রোগীদের ছেড়ে দিইনি বা বের করে দিইনি’ : গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আদ্্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। তবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আইনের নির্ধারিত ৩০ দিন সময়ের মধ্যে, আগামী রোববারের মধ্যেই আমরা সরকারের কাছে আপিল সম্পন্ন করব। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জনস্বার্থ বিবেচনায় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের যেন কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়, সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাইলেও এত দ্রুত রোগীদের সরিয়ে দিতে পারি না, তাই বর্তমানে ভর্তি রোগীদের সেবা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। আমরা রোগীদের ছেড়ে দিইনি বা বের করে দিইনি। সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার বলেছে আদ্-দ্বীনের আরও কয়েকটি হাসপাতাল রয়েছে এবং রোগীরা সেখানে যেতে পারবে। তবে সরকার রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করতে বলেনি। বিশেষ করে নবজাতকদের জন্য থাকা এনআইসিইউ সুবিধা শুধু আমাদের মগবাজার হাসপাতালেই রয়েছে। অন্য শাখাগুলোতে এই বিশেষায়িত ইউনিট না থাকায় রোগীদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন হাসপাতালে এনআইসিইউ সুবিধা রয়েছে, সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, আমরা সেভাবেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকেই নতুন রোগী ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচিত পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটি ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি আমরা দিচ্ছি।’
নেপথ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু : গত ২৭ মে ভোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ৪ জুন প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটি হাসপাতাল পরিচালনার অনুপযুক্ত। ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে ধারণক্ষমতার বাইরে প্রায় ৫০ জন মানুষের উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন না থাকায় বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া নবজাতকদের অবস্থা খারাপ হলেও কোনো সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স বা চিকিৎসক ছিলেন না এবং দায়িত্বরত সেবিকাদের চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ অনুযায়ী শোকজ করা হয়। ৭ জুন বিকেল ৫টার মধ্যে দেওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ১১ জুন লাইসেন্স বাতিল করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, লাইসেন্স বাতিলের পর আর চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই, তাই দ্রুত রোগী সরাতে হবে। তবে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল নিয়ে নতুন বিতর্ক : এদিকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পক্ষের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে নতুন এক বিতর্ক সামনে এনেছেন। তার দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মূল হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স নম্বর ব্যবহার করে সেটি বাতিল করেছে। এই ভুলের জন্য তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবহেলাকে দায়ী করেন। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

