আসরটা যখন ৪৮ দলের, তখন ফুটবল রোমাঞ্চের পাশাপাশি বিচিত্র সব রূপকথা আর ট্র্যাজেডির জন্ম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কাতার বিশ^কাপে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার কিংবা ১৯৯০-এ ক্যামেরুনের সেই রূপকথাÑ বিশ^কাপের ইতিহাস বরাবরই অঘটনের গল্পে ভরপুর। এবারের মেগা বিশ^কাপেও একদিকে যেমন দেখা যাবে ‘হেভিওয়েট’ দ্বৈরথ, অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হতে যাচ্ছেন ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ অর্থাৎ শক্তি ও র্যাঙ্কিংয়ের আকাশ-পাতাল ব্যবধানের কিছু অসম লড়াইয়ের। মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিটদের চমকে দিয়ে র্যাঙ্কিংয়ের তলানির কোনো দল কি ঘটিয়ে দেবে নতুন কোনো অঘটন? নাকি গোলবন্যায় ভেসে যাবে আন্ডারডগরা?
সবচেয়ে বড় ব্যবধানের লড়াইটি জমবে ‘সি’ গ্রুপে, যেখানে আগামী ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়ার মাঠে হাইতির মুখোমুখি হচ্ছে হেক্সা মিশনের খোঁজে থাকা ব্রাজিল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সেলেসাওদের অবস্থান এখন ছয়ে, আর হাইতি পড়ে আছে ৮৩ নম্বরে। অর্থাৎ, মাঠের লড়াইয়ের আগেই দুই দলের কাগজের ব্যবধান ৭৭ ধাপের। মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও কথা বলছে ব্রাজিলের পক্ষে। এর আগের তিনবারের দেখায় প্রতিটিতেই জিতেছে হলুদ শিবির, যার শেষ দুই ম্যাচেই হাইতির জালে তারা বল পাঠিয়েছে ১৩ বার। এর ওপর দীর্ঘ ৫২ বছর পর (সর্বশেষ ১৯৭৪) বিশ^মঞ্চে ফেরা হাইতির জন্য ব্রাজিলের ‘সাম্বা ছন্দের’ সামনে নিজেদের রক্ষণ টিকিয়ে রাখাই হবে প্রধান পরীক্ষা।
শুধু ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচই নয়, এবারের বিশ্বকাপে যোজন যোজন ব্যবধানের আরও কিছু হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ রয়েছে। গ্রুপ ‘ই’-তে আগামী ১৪ জুন হিউস্টন স্টেডিয়ামে চারবারের বিশ^চ্যাম্পিয়ন ও র্যাঙ্কিংয়ের দশম স্থানে থাকা জার্মানির মুখোমুখি হবে ৮২ নম্বরে থাকা কুরাসাও। প্রথমবারের মতো বিশ^মঞ্চের টিকিট পাওয়া কুরাসাওয়ের জন্য জার্মানির অভিজ্ঞতার প্রাচীর ভাঙা অলৌকিক কিছুর মতোই। এ ছাড়া বেলজিয়াম ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার র্যাঙ্কিং ব্যবধান ৭৬ ধাপের (যথাক্রমে ৯ ও ৮৫)। রেড ডেভিলরা এবার ততটা ফেভারিট না হলেও, দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে আসা কিউইদের বিপক্ষে তাদের অনায়াস জয়ই প্রত্যাশা করছে ফুটবল বিশ্ব। অন্যদিকে, স্পেন বনাম কেপ ভার্দে ম্যাচেও শক্তির বড় তফাত চোখে পড়বে স্পষ্ট।
তবে এর ব্যতিক্রম হতে পারে ‘এল’ গ্রুপের ইংল্যান্ড ও ঘানার মধ্যকার ম্যাচটি। র্যাঙ্কিংয়ে থ্রি লায়ন্সরা ৪ নম্বরে আর ঘানা আছে ৭৩ নম্বরেÑ ব্যবধানটা ৬৯ ধাপের হলেও হ্যারি কেইনদের জন্য ঘানাকে শতভাগ ফেভারিট ভাবা ভুল হবে। কারণ আফ্রিকান পরাশক্তি ঘানার ২০০৬ আসরে শেষ ১৬ এবং ২০১০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এই ম্যাচে লড়াইটা হবে সমানে সমানে।
কাগজে-কলমে বা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে শক্তির এই বিশাল তারতম্য ফেভারিটদের এগিয়ে রাখলেও বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে বল গড়ানোর পর কোনো হিসাবই খাটে না। নির্দিষ্ট দিনে ট্যাকটিক্স আর স্নায়ুর লড়াইয়ে যে দল সেরাটা দেবে, শেষ হাসি থাকবে তাদের মুখেই। পরাশক্তিরা কি পারবে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে, নাকি আরেকটি বিশ্বকাপ দেখবে নতুন কোনো রূপকথা? উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।

