তিনি যখন পর্দায় আসেন, দর্শকের মনে হয় কোনো এক ঝরা বকুল কিংবা শান্ত নদীর শান্ত স্রোত বয়ে গেল। তিনি রাইমা সেন। বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের যোগ্য উত্তরসূরি এবং মুনমুন সেনের কন্যা। বংশপরম্পরায় রক্তের গভীরে থাকা সেই কালজয়ী আভিজাত্য আর রাজকীয় মায়াকে তিনি শুধু ধরে রাখেনি, বরং নিজের অভিনয় নৈপুণ্যে তাকে দিয়েছেন এক নতুন মাত্রা। পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই যেন কবিতার একেকটি চরণ। ‘চোখের বালি’-র সেই অবুঝ ও সরল আশালতা হোক, কিংবা ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর আধুনিক মনস্তত্ত্বÑ প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে মেলে ধরেছেন অনন্য এক ছন্দে। কোনো কৃত্রিমতা নয়, কেবল চোখের ভাষায় আর ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসিতেই তিনি জয় করেছেন লাখো দর্শকের হৃদয়। বড় পর্দা থেকে শুরু করে হালের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সব মাধ্যমেই রাইমা যেন এক চিরসবুজ বসন্ত। সেন কেবল একজন অভিনেত্রী নন; তিনি বাংলা সিনেমার এক চলমান কবিতা, যার প্রতিটি পাতাজুড়ে রয়েছে মুগ্ধতার গল্প। সদ্য এই অভিনেত্রী কাজ ও সমসাময়িক প্রসঙ্গে কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুহুল আমিন ভূঁইয়া
কী কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন?
এই মুহূর্তে কয়েকটি সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। পাশাপাশি কিছু নতুন স্ক্রিপ্ট পড়ছি। এখন আমি কাজের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বেছে চলি, তাই যেটা করি, মন দিয়েই করি।
‘হাওয়া বদল’ আবার মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাটি নিয়ে জানতে চাই
‘হাওয়া বদল’ আমার কাছে খুব স্পেশাল একটা সিনেমা। এই সিনেমাটা যখন প্রথম মুক্তি পেয়েছিল, দর্শক খুব ভালোবাসা দিয়েছিলেন। আমার চরিত্রটাও খুব প্রাণবন্ত, সম্পর্ক আর আবেগের অনেক স্তর ছিল সেখানে। এত বছর পর সিনেমাটা আবার বড় পর্দায় এসেছে, এটা সত্যিই আনন্দের।
সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশা কেমন?
প্রত্যাশা একটাইÑ নতুন প্রজন্মের দর্শক সিনেমাটা আবিষ্কার করুক। ভালো গল্প কখনো পুরোনো হয় না। আশা করি, আগের মতোই মানুষ সিনেমাটাকে আপন করে নেবেন।
রাইমা-পরমব্রত-রুদ্রনীল আইকনিক ট্রায়ো। আশাবাদী?
অবশ্যই। আমাদের মধ্যে অফ-স্ক্রিন বন্ধুত্বও ছিল, যার প্রভাব পর্দায় পড়েছে। সেই রসায়ন দর্শক পছন্দ করেছিলেন। তাই সিনেমার পুনমুক্তি নিয়ে আমি আশাবাদী।
টালিউডের নানা পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?
পরিবর্তন তো সব শিল্পেরই অংশ। সময়ের সঙ্গে কাঠামো বদলায়, কাজের ধরন বদলায়। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত ভালো কাজই টিকে থাকে। শিল্পীদের জন্য সুস্থ পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।
‘কেরালায় কুণ্ঠেশ্বরী’ ও আপনার চরিত্র সম্পর্কে বলুন
এখনই খুব বেশি বলতে পারব না। তবে চরিত্রটি আমার কাছে বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং অন্যরকম। গল্পের প্রয়োজনে অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ে কাজ করেছি। আশা করি, দর্শকদের ভালো লাগবে।
হাতে আর কী কাজ আছে?
কয়েকটি সিনেমা ও ওটিটি প্রজেক্ট নিয়ে কথা চলছে। কিছু কাজের শুটিংও চলছে। সময়মতো সব জানাতে পারব।
মেনস্ট্রিম সিনেমায় আপনাকে কম দেখা যায় কেন?
আসলে আমি সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দিই। সব ধরনের কাজই করতে চাই, কিন্তু চরিত্রটা আমাকে টানতে হবে। তাই হয়তো আমাকে কম দেখা যায়।
বাংলাদেশ থেকে কাজের প্রস্তাব পেয়েছেন? আগ্রহী?
বাংলাদেশের দর্শকদের কাছ থেকে আমি অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। ভালো গল্প, ভালো চরিত্র আর ভালো টিম হলে অবশ্যই কাজ করতে আগ্রহী।
২৫ বছরের ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কী?
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দর্শকদের ভালোবাসা। এত বছর পরেও মানুষ আমার কাজ নিয়ে কথা বলেন, এটাই বড় পাওয়া। অপ্রাপ্তি নিয়ে খুব বেশি ভাবি না, কারণ প্রত্যেক অভিজ্ঞতাই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।
এখন কী ধরনের কাজ ভেতর থেকে টানে?
যে চরিত্র আমাকে নতুন কিছু ভাবতে বাধ্য করে, যেটা অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমাকে চ্যালেঞ্জ করেÑ সেই কাজই এখন সবচেয়ে বেশি টানে।
পারিবারিক পরিচয়ের চাপ কীভাবে সামলেছেন?
চাপ ছিল, সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে হয়। আমি সবসময় কাজ দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছি।
এখনো বিয়ে করেননি। একাকিত্ব বোধ হয় না?
একাকিত্ব আর একা থাকা এক জিনিস নয়। আমি নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে শিখেছি। পরিবার, বন্ধু, কাজ- সব মিলিয়ে জীবন বেশ পরিপূর্ণ।
৪৬ বছর পেরিয়েও অবিবাহিত। আলাদা কোনো কারণ আছে?
বিয়ে আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত বিষয়। শুধু সমাজের প্রত্যাশা পূরণের জন্য বিয়ে করতে চাইনি। যখন যেটা সঠিক মনে হবে, সেটাই করব।
প্রেমে বিশ্বাস করেন?
অবশ্যই করি। প্রেম ছাড়া জীবন খুব নিরস। তবে এখন প্রেমকে আমি অনেক বেশি পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখিÑ শুধু রোম্যান্স নয়, সম্মান, বিশ্বাস আর বন্ধুত্বও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রেম করলে কি প্রকাশ করবেন?
(হাসি) সব কথা তো আর সবাইকে বলা যায় না! জীবনের কিছু অংশ নিজের কাছেই রাখতে ভালো লাগে।

