সংসার, সন্তান আর চার দেয়ালের চেনা জগৎÑ অনেকের জীবনের গল্পটা এখানেই শেষ হয়। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তেমনই একজন ব্যতিক্রম রেশমা আহমেদ। দুই সন্তানের মধ্যে একজনকে চিকিৎসক ও আরেকজনকে প্রকৌশলী বানিয়ে জীবনের একাকিত্ব দূর করতে শখের বশে পা রেখেছিলেন শোবিজে। আজ সেই শখের অভিনয়ই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিগত কয়েক বছরে তার অভিনয় ও ব্যস্ততা দুই-ই আকাশ ছুঁয়েছে। গেল ঈদের জন্য টানা ১ মাস ২৪ দিন কাজ করে প্রমাণ করেছেন নিজের তুমুল ব্যস্ততা। সম্প্রতি দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে এক আড্ডায় এই অভিনেত্রী কথা বলেছেন তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো, কাজের দর্শন ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা গল্প নিয়ে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো রেশমা আহমেদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কঠিন পথ আজ সহজ হয়ে উঠেছে। অভিনয়ের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি বলেন, ‘একমাত্র অভিনয় দিয়েই দর্শকের মন জয় করা যায়, আর কিছু লাগে না। অভিনয়ের পরিবর্তন তো প্রতিনিয়তই হচ্ছে। আগের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করছি, সামনে আরও ভালো করতে চাই।’
কখনো তাকে মায়ের চরিত্রে, কখনো তাকে বোন বা ভাবীর চরিত্রে অভিনয়ে দেখা যায়। তবে দর্শক তাকে বিগত কয়েক বছরে বহু নাটকে মায়ের চরিত্রে অভিনয়ে দেখতে দেখতে তাকে মা চরিত্রে অভিনয়ে দেখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। চরিত্রাভিনেত্রী হিসাবে তার জুড়ি নেই। সব ধরনের চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করে এরই মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
জনপ্রিয়তা কিংবা আর্থিক সচ্ছলতার জন্য রেশমা আহমেদ অভিনয়ে আসেননি। দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রীদের ব্যস্ততার পর নিজের একাকিত্ব কাটাতেই ২০২০ সাল থেকে পেশাদারভাবে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে এখন কাজটাই তার সব। নিজের কাজ নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার প্রাণ, আমার আশা, আমার জীবন, আমার সুস্থতাÑ সবকিছুই এখন আমার কাজে। আল্লাহর কাছে আশা করি, আমার মৃত্যু যেন শুটিং সেটেই হয়। আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই।’
তবে এই আকাশচুম্বী ব্যস্ততার কারণে কিছুটা বিপাকেও পড়েছেন তিনি। ইউটিউব কোম্পানিগুলো এক মাস আগেই তার শিডিউল লক করে ফেলে। ফলে হুট করে আসা বড় বাজেট বা ব্র্যান্ডের কাজগুলো তিনি মিস করছেন। তাই এখন থেকে গল্প দেখে, বেছে বেছে কাজ করার এবং কাজের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
শুটিং সেটে প্রধান চরিত্রের তারকাদের দেরিতে আসা এবং সহ-শিল্পীদের অপেক্ষা করাটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন রেশমা আহমেদ। লেট নাইট শুটিংয়ের পর বিশ্রামের প্রয়োজনেই এমনটা হয় বলে তিনি মনে করেন। তবে একটি বিষয়ে তিনি বেশ জোর দিয়ে বলেন, ‘বাবা-মার চরিত্রে যারা কাজ করেন, তাদের বয়স সাধারণত ৪০ ঊর্ধ্ব হয়। তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে, না ঘুমালে শরীর খারাপ হয়। আমি চাইব, নাটকে বাবা-মার সিকোয়েন্সগুলো যেন আগে ধারণ করে রাত ১১টার মধ্যে তাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।’
পারিশ্রমিক নিয়ে নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে রেশমা বলেন, ‘যোগ্যতা, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। কিছু মানুষ দুর্বলদের ঠকানোর চেষ্টা করলেও তার ক্ষেত্রে সমস্যা হয় না, অনেকেই তাকে অগ্রিম পারিশ্রমিক দিয়ে দেন।’
বর্তমান সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জোয়ার চললেও রেশমা আহমেদকে সেখানে দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘ওটিটিতে অডিশন, গ্রুমিংয়ের একটা বিষয় থাকে। দেখা যায় ৩ দিনের ডেট নিয়ে ৬ দিন বসিয়ে রাখছে। নাটকে আমি মাসে ৩০ দিনই ব্যস্ত থাকি। ওটিটির এই সময়ের ঝামেলার কারণে নাটকের কাজে পিছিয়ে পড়তে হয়, তাই আমি ওটিটিতে আগ্রহ প্রকাশ করি না।’
ছোটবেলায় রেশমা আহমেদের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। নিজে হতে না পারলেও সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন সন্তানদের মাধ্যমে। বড় ছেলেকে ডাক্তার এবং ছোট ছেলেকে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন। পুরো সংসার গুছিয়ে, সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার পরই তিনি অভিনয়ে মন দিয়েছেন।
সংসার সামলানো সেই সাধারণ গৃহিণী আজ দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত এক তুমুল ব্যস্ত অভিনয়শিল্পী। তার অভিনীত অসংখ্য চরিত্র দর্শক হৃদয় জয় করেছে। দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তিনি মনে করেন, এখন আর যেমন-তেমন অভিনয় করলে চলবে না, প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই পরীক্ষা তিনি আনন্দের সঙ্গেই দিয়ে চলেছেন।

