ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

ভিনদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:৪৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক সূত্র এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং শর্তসাপেক্ষে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করা হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতার অংশ হিসেবে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। এর আওতায় লেবাননের পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

খসড়া চুক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিক জানান, চুক্তির বিষয় নিয়ে উভয়পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বাকি রয়েছে। ইরানের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের একটি অংশ ইতোমধ্যে এতে সম্মতি দিলেও সর্বোচ্চ নেতার চূড়ান্ত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, সপ্তাহান্তে চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আয়োজন হতে পারে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

গত কয়েক মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিকবার চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেঙে পড়েছিল। তবু এবার মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আশাবাদী যে, সমঝোতাটি বাস্তবায়নের পথে এগোবে।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। প্রস্তাব অনুযায়ী, তেহরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না। একই সঙ্গে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে চলমান বিরোধ সমাধানের একটি কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, জাতিসংঘের পরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় নামিয়ে আনার একটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো বাস্তব পদক্ষেপ কার্যকর হবে আরও বিস্তৃত ও বিস্তারিত দ্বিতীয় একটি চুক্তি সম্পাদনের পর। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় ধাপের সেই চুক্তিই হবে সবচেয়ে কঠিন অংশ। কারণ পারমাণবিক কর্মসূচির বিস্তারিত শর্ত, পরিদর্শনব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি।

চুক্তির আরেকটি বড় দিক হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। খসড়া অনুযায়ী, সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের সমপরিমাণ জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করা হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও তার অবরোধমূলক পদক্ষেপ শিথিল করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি সচল হওয়ার পর ইরানকে ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা-ছাড় দেওয়া হতে পারে। এতে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানির সুযোগ পাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।

তবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও অর্থ ফেরতের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরই তাদের কিছু অর্থ ছাড় করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় করা হবে।

এদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতার নাম রাখা হয়েছে ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চলছে এবং স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণে কাজ করছেন মধ্যস্থতাকারীরা। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, এই সমঝোতা শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কেই নতুন অধ্যায় সূচনা করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।