ভারতের উত্তর প্রদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের রাজ্যপাল আনন্দীবেন প্যাটেল। রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার সমর্থিত এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের খবরটি নিশ্চিত করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস।
রাজ্যপালের সচিবালয় থেকে রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান, উপাচার্য ও পরিচালকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কল্যাণব্যবস্থা, পরামর্শসেবা, নজরদারি কাঠামো, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, বিভিন্ন প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে যে, কিছু শিক্ষার্থীকে প্রলোভন, মানসিক চাপ বা অন্য অনৈতিক উপায়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করা, ভয় দেখানো, মানসিক চাপ সৃষ্টি করা বা অনৈতিক সুবিধা দিয়ে কোনো ধরনের বেআইনি বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, অনৈতিক ও আইনবিরোধী।
আরেকটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রলোভন বা মানসিক চাপে ফেলে ধর্মান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছেÑ এমন অভিযোগ নিয়মিত পাওয়ার পরই এই নির্দেশনা দেওয়া হলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ‘উগ্রবাদবিরোধী ইউনিট’ বা শিক্ষার্থী কল্যাণ সেলকে আরও সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং আইনগত অধিকার বিষয়ে বক্তৃতা ও সেমিনারের আয়োজনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি যদি ধর্মান্তরের মতো সন্দেহজনক কার্যক্রমে জড়িত থাকে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানাতে হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাজ্যের ধর্মান্তরবিরোধী আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এই আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ একাধিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, এই ধর্মান্তরবিরোধী আইনটি অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ উদ্যোগে বা রাজনৈতিক নির্দেশনায় অপব্যবহার করে থাকে। একই সঙ্গে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরাও সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানির জন্য এই আইনটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, কোনো অ-হিন্দু প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক সংগঠন যদি অভাবী মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বা সাধারণ প্রার্থনা সভার আয়োজনও করে, তাহলেও তা চরম তদন্ত ও নজরদারির আওতায় চলে আসে। এরপর শুরু হয় আইনি ও বেআইনি নানা হয়রানি। এমন বহু নজির রয়েছে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অভিযোগ দায়ের করার পর পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা বা গ্রেপ্তার করেছে। যদিও আদালতে এই ধরনের মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়া বা দ-ের হার খুবই কম, তবে গ্রেপ্তার, মামলা ও আইনি হয়রানির কারণে স্থানীয় সামাজিক সম্প্রীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনগুলো ধর্মান্তর ঠেকানোর চেয়ে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিলে উত্তর প্রদেশ বেআইনি ধর্মান্তর নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২১-এর অধীনে একের পর এক মিথ্যা এফআইআর (প্রথম তথ্য প্রতিবেদন) দায়েরের ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক প্রবণতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এলাহাবাদ উচ্চ আদালত। আদালত এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্যসচিবকে (স্বরাষ্ট্র) ব্যক্তিগত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে এ ধরনের মিথ্যা মামলা ও অপব্যবহার রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

