রাজশাহীর তানোরে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ নিয়ে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ভা-াইল আশ্রয়ণ গুচ্ছগ্রামে ৪৩টি পাকা ঘর নির্মাণের পর বরাদ্দ প্রক্রিয়া ঘিরে নজিরবিহীন আত্মীয়করণের চিত্র ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী প্রকৃত ভূমিহীনদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজনদের ঘর দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের ভা-াইল মৌজায় ৩৮ বিঘা সরকারি খাস সম্পত্তিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৫০টি টিনের ঘর নির্মাণ করে স্থানীয় ভূমিহীনদের মাঝে দলিলসহ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পটি পরিচালনার জন্য একটি সমিতি গঠন করা হয় এবং প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের পুকুরটি বাসিন্দাদের জীবিকার উৎস হিসেবে প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২২ সালে ওই টিনের ঘরগুলো ভেঙে সেখানে ৪৩টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। এরপরই শুরু হয় অনিয়মের নতুন অধ্যায়।
অভিযোগ রয়েছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলাম নিজের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়াকে নিজের কবজায় নিয়ে নিয়েছেন। দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের বাদ দিয়ে তিনি নিজের স্ত্রী, পুত্র হৃদয়, দুই ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসলাম, শ্যালক, সমন্ধী ও মামাতো-খালাতো ভাইসহ প্রায় ২০ জন নিকটাত্মীয়ের নামে পাকা ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী মৃত শমসের আলীর স্ত্রী সোনাভান (৫৫) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আতিকুলের নিজস্ব বাড়ি থাকার পরেও সে ও তার পরিবারের সদস্যরা পাকা ঘর পেয়েছে। অথচ আমি ১৫ বছর ধরে ওই আশ্রয়ণে ছিলাম। নতুন ঘর পাওয়ার পর আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন কবরস্থানের পাশে ঝুপড়িঘরে রোদ-বৃষ্টিতে দিনযাপন করছি। আমরা গরিব বলে কি আমাদের কোনো অধিকার নেই?
একই অভিযোগ মরিজান বেওয়া ও মেছের আলীর। তাদের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত পুকুরটি থেকে বছরে ৬-৭ লাখ টাকা আয় হয়। এই পুকুরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়াতেই যারা সোচ্চার ছিলেন, তাদেরই কৌশলে নতুন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় অনেক নামধারী ব্যক্তি থাকলেও বাস্তবে ওই ঘরে কেউ থাকে না।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসব অনিয়ম নিয়ে তারা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির অভাবে এবং প্রভাবশালীদের ক্ষমতার দাপটে প্রকৃত ভূমিহীনরা আজ গৃহহীন।
অভিযোগের বিষয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি আছে ঠিকই, তবে সেটি সরকারি খাসজমিতে। সরকার যদি উচ্ছেদ করে, সেই ভয়েই আমি পাকা ঘর নিয়েছি। তালিকার বিষয়ে আমি শুধু নাম জমা দিয়েছি, বরাদ্দ দিয়েছে প্রশাসন। এখানে আমার কিছু করার নেই। যদিও তার এই দাবিকে স্থানীয়রা অস্বীকার করেছেন।
ভুক্তভোগীরা প্রকল্পের সুফল প্রকৃত ভূমিহীনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে তালিকা যাচাই-বাছাই করা না হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, যাদের পূর্বের দলিলসহ লিজ আছে, তাদের নতুন ঘর পাওয়ার কথা। যাদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের বের করে দেওয়া বেআইনি হবে। তবে যদি প্রকৃত ভূমিহীন থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

