ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

রামিসা হত্যা মামলার রায়ের গতি ছুঁয়েছে পুরোনো ফাইলও

ইকবাল হাসান ফরিদ
প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৫:২৩ এএম

রাজধানীর পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা হত্যা মামলায় মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মৃত্যুদ-ের রায় দেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু একটি মামলার দ্রুত বিচারই নয়, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উচ্চ আদালতের করিডরে বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা বহু আলোচিত মামলার ওপরও।

বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ছিল, নি¤œ আদালতের রায় কি শেষ পর্যন্ত কাগজেই আটকে থাকবে? সেই প্রশ্নের মধ্যেই নতুন করে নড়েচড়ে বসেছে বিচার প্রশাসন। আলোচনায় এসেছে ডেথ রেফারেন্সের জট, আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রতা এবং বহুল আলোচিত মামলাগুলোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

এরই মধ্যে মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা অতিক্রম করে পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, রামিসা মামলাকে ঘিরে জনমতের চাপ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের সক্রিয় অবস্থান উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা পুরোনো মামলাগুলোকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, রামিসার মতো দ্রুততার নজির কি আছিয়া, রাজন, রাকিব, নুসরাত কিংবা আবরার হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও দেখা যাবে? আইন বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিশেষ উদ্যোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে পর্যায়ক্রমে এসব মামলাও গতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নি¤œ আদালতের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়াই ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে বহু মামলার আসামি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। একইভাবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতির জন্য।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রায় ঘোষণা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই রায়ের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমি আশাবাদী সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে অন্য সব চাঞ্চল্যকর মামলাও গতি পাবে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকলে মানুষের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়। বিচারকের ঘাটতি ও মামলাজট আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতি কাটাতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন এবং বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।

মাগুরার শিশু আছিয়া খাতুন ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। ২০২৫ সালের মার্চে সংঘটিত এ ঘটনায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা দেয়। তদন্ত, চার্জশিট এবং বিচার কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়। মাত্র দুই মাসের মধ্যে বিচারিক আদালত প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদ-ের রায় দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মামলার পেপারবুক ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টে পৌঁছেছে। এখন নথি যাচাই-বাছাই শেষে প্রধান বিচারপতি শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করবেন। আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, আছিয়া মামলার অগ্রগতি এখন রামিসা মামলার পরবর্তী ধাপগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

এদিকে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু রাজনকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ক্ষোভের ঝড় ওঠে। বিচারিক আদালত দ্রুত রায় দিলেও প্রায় এক যুগ পরও মামলার ডেথ রেফারেন্স চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। একই বছর খুলনায় সাইকেল ওয়ার্কশপে কর্মরত শিশু রাকিবকে শরীরে বায়ু পাম্পের চাপ দিয়ে হত্যা করা হয়। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সেই মামলাতেও আসামির মৃত্যুদ-ের রায় হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। একই বছরের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামিকে মৃত্যুদ- দেন। বিচারিক আদালতের দ্রুত বিচার সে সময় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু সাত বছর পরও মামলাটি উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে দ- কার্যকর হওয়ার পথও দীর্ঘ হচ্ছে। আইনজীবীরা বলছেন, পেপারবুক প্রস্তুত, নথি যাচাই এবং বেঞ্চসংকটের মতো কারণে অনেক মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

অন্যদিকে চাঁদপুরের আলোচিত পারভীন হত্যা মামলায় ২০২৪ সালের ৯ জুলাই সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মৃত্যুদ- বহাল রাখেন হাইকোর্ট। তবে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো দ- কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা এবং মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা।

বিচার বিশ্লেষকদের মতে, এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে নতুন কোনো মামলায় দ্রুত রায় ঘোষণার বার্তা জনমনে প্রত্যাশিত আস্থা তৈরি করতে পারবে না।

রামিসা মামলার ডেথ রেফারেন্স দ্রুত শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার বিরতিহীনভাবে চলবে বলে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ বেঞ্চের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ডেথ রেফারেন্স শুনানি এগিয়ে নেওয়া গেলে বহুদিন ধরে আটকে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তিও ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে সাবেক বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, শুধু একটি বা দুটি মামলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিলে হবে না। ডেথ রেফারেন্স ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। না হলে নতুন মামলা দ্রুত এগোলেও পুরোনো ফাইলের পাহাড় কমবে না।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রূশদ হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় থাকা মামলাগুলোও পর্যায়ক্রমে গতি পাবে বলে আমরা আশাবাদী। বিচারপ্রার্থীরা খুব দ্রুত তাদের কাক্সিক্ষত ন্যায়বিচার পাবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য অনেকাংশে ব্যাহত হয়। রামিসা হত্যাকা-ের দ্রুত বিচার নতুন আশা জাগিয়েছে। এখন সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু তদন্ত ও বিচারিক আদালতের রায় নয়, আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের দীর্ঘ পথও দ্রুত অতিক্রম করতে হবে। কারণ বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন রায় শুধু ঘোষণা নয়, চূড়ান্ত নিষ্পত্তিরও মুখ দেখে।