মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ অবসান এবং বিশ্ব অর্থনীতি সচল করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব রাজনীতি। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আর চুক্তি সই হতে পারে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। তথ্যসূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। দুই দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে নেপথ্যের নায়ক ও প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। ইতিমধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক সব চুক্তির দেশ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভেন্যু হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ডিজিটাল স্বাক্ষর ও দুই ধাপের শান্তি প্রক্রিয়া : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এতে ‘ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর’ বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই করবেন। এরপর আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে কারিগরি ও কৌশলগত পর্যায়ের দীর্ঘ আলোচনা। এই শান্তি আলোচনা সফল করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা এবং আমেরিকা ও ইরানের আন্তরিকতার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য চুক্তির পুরো কাঠামো ও ব্লুপ্রিন্ট বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। আরাগচি জানান, পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি মূলত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রাথমিক চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা ইরানের সমস্ত আর্থিক সম্পদ একযোগে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যা প্রায় ৬০ দিন স্থায়ী হবে এবং এই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উভয় পক্ষ টেবিলে বসবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, অতি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং সামগ্রিক পারমাণবিক ইস্যুটিকে কৌশলেই প্রথম ধাপ থেকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে। আমেরিকা চেয়েছিল ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিক, কিন্তু ইরান তাদের অবস্থানে অনড়। আরাগচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো হবে না, বরং তা ইরানের ভেতরেই তরল করা হবে এবং এটাই একমাত্র উপায়। দ্বিতীয় ধাপের ৬০ দিনের আলোচনায় আমেরিকার আরোপিত সব অবৈধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। যদি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব না হয়, তাহলে পুরো পরিস্থিতি আবার আগের যুদ্ধকালীন অবস্থায় ফিরে যাবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে হুংকার ছেড়ে আরাগচি বলেন, আমেরিকা-ইসরাইলের অত্যাধুনিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এই অন্যায় যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের কূটনীতি মূলত রণাঙ্গনের এই বিজয়কে চুক্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে মাত্র। এই চুক্তির প্রথম শর্তই হচ্ছে ইরানের ওপর আমেরিকার দেওয়া অবৈধ নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিতে বিপুল আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান আসবে। ইতিহাসে এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাপ্তরিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে বাধ্য হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ও লেবানন নিয়ে নতুন সমীকরণ : চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং কোনো পক্ষই আর শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি নতুন আইনি ও পরিচালনকাঠামো ঘোষণা করবে ইরান। তবে মার্কিন ব্লক বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগপর্যন্ত প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন