বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল, উন্মুক্ত ও নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। পাশপাশি ‘স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও উন্নয়ন’Ñ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন গতি আনার বার্তাও দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি (বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পথনকশা)’ শীর্ষক ওই সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে উদ্বোধনী অধিবেশনের পাশাপাশি তিনটি আলাদা কর্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বাধা এবং সরবরাহ চেইনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পটভূমিতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাকে নতুনভাবে সাজানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’ চলমান জ¦ালানি সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের উদ্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বন্ধুত্বের মূল ভিত্তির ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকবে। বাংলাদেশ আপনাদের অংশীদারিত্বকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। আমরা বিশ্বমঞ্চে একটি নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।;
বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সক্রিয় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করার জন্য নতুনভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে এ সময় জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি এবং এই সরকার আপনাদের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরা স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে কেবল করদাতা হিসেবে দেখি না, বরং আমাদের কৌশলগত অংশীদার মনে করি।’ সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সব মহল থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে ব্যবসায়ীদের আশ^স্ত করেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমান পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রধান বাজারগুলোর প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি। এতে দেশের রপ্তানি অবস্থান ধরে রাখতে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হবে।
উন্নত দেশগুলো যেখানে ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে, সেখানে উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই হার ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি। এটি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জলবায়ু ঝুঁকি ও ঋণের বোঝার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকির কারণে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে বার্ষিক অতিরিক্ত ২০ বিলিয়ন ডলার সুদ দিতে হচ্ছে, যার ফলে বৈদেশিক ঋণ এবং জলবায়ু সংকট একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।’
চলমান জ¦ালানি সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ¦ালানির পেছনে খরচ বেড়েছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ ও সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে, এতে চ্যালেঞ্জের মাত্রা বেড়েছে। সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লকচেইন এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির ব্যবহার, যা বিশ্ববাণিজ্যকে দ্রুত বদলে দিয়ে একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ দুই-ই তৈরি করছে।’
তিনি উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সার্বিকভাবে এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক সুযোগও নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দৃঢ প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

