শেষ পর্যন্ত খাঁচাবন্দি (গ্রেপ্তার) হলেন এক সময়ের দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ২ বছরের মধ্যে দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন দুর্নীতিবাজ, নানা অপকর্মের হোতা সাবেক এ পুলিশ কর্মকর্তা। গত ১২ জুন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানায় দুবাই সরকার। গতকাল রোববার তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়ে তিনি হয়েছিলেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক ও শেষে পুলিশ বাহিনী প্রধান।
বেনজীরের গ্রেপ্তারের ইস্যুতে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ১২ জুন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান।
দুদক কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পৃথক অবৈধ সম্পদ অর্জন ও পাটপোর্ট জালিয়াতির ঘটনায় ছয়টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় এরই মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং সেই মামলার বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আকতারুল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার পরও বেনজীর আহমেদ জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক বেসরকারি পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত বছর অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয়। মামলাগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বিভিন্ন জেলায় শত শত বিঘা জমি, কোম্পানির শেয়ার, ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে।
২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের ২৮তম মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিয়োগ পান বেনজীর আহমেদ। ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। এর আগে তিনি ডিএমপি কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর ২০২৪ সালের মার্চে ‘বেনজীরের বিরুদ্ধে করা’ দুটি প্রতিবেদনে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা কর্মকা-ের কথা প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন আমলে নিয়ে একই বছরের ২২ এপ্রিল বেনজীরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। এরপরই দুর্নীতি দমন কমিশন বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের মধ্যে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে দুবাই চলে যান সাবেক আইজপি বেনজীর আহমেদ। তার দেশত্যাগের পর একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। মামলার পর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। ২০২৫ সালে ২০ মার্চ বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখায় আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখা থেকে বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়।
বেনজীরের গ্রেপ্তার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল ২০২৫ এটি পাঠানো হয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি মনিটর করেছি। ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে। উক্ত রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ করা হয়। ওই রেড নোটিশের ভিত্তিতেই বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি (বেনজীর) বর্তমানে সেখানে (দুবাইয়ে) আটক আছেন। আবুধাবির এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। বেনজীরের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২৬(২) ও ২৭ ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে।
বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গ্রেপ্তারের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। মন্ত্রী বলেন, এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।
যেভাবে দেশ ছাড়েন বেনজীর : ২০২২ সালে স্বাভাবিক অবসরে যাওয়া বেনজীর আহমেদ দেশেই প্রটোকল নিয়ে থাকতে শুরু করেন। জড়িয়ে যান একাধিক ব্যবসায়। আইজিপি থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন বেনজীর আহমেদ। কিন্তু তিনি অধরাই থেকে যান। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর অনুসন্ধান শুরু হলেও তাকে দুদকের মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের আগে ৪ মে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ। তাকে পালাতে সহযোগিতা করেন পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার কিছু কর্মকর্তা। বেনজীর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরই তার দেশত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ পায়। পরে বেনজীর কীভাবে পালিয়েছেন সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান উচ্চ আদালত। তবে এ বিষয়ে তদন্ত করা হলেও বেনজীরকে পালাতে সহযোগিতা করা ইমিগ্রেশন পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় যা বলা হয়েছে : বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলাসহ মোট ৬টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়, যা বিচারাধীন। গত বছরের মে মাসে ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। সেই মামলা বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের পুলিশ। তাকে পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বেনজীর ছাড়া বাকি আসামিরা হলেনÑ পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক ও বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসাবে কর্মরত থাকাবস্থায় হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) জন্য আবেদন করেন। আবেদন ফরমে ‘অফিসিয়াল’ হিসেবে মার্ক করা হয়। তার আবেদনপত্রের প্রফেশনের ক্রমিকে সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করা হয়। পরে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায়ও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে জালিয়াতি-প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। অন্যান্য সময়েও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)/ই-পাসপোর্টের (ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট) জন্য আবেদন করেছেন। এজাহারে আরও বলা হয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আসামিরা বেনজীর আহমেদের দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থেকেও অন্য আসামিরা বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ না করে কিংবা যাচাই না করে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট কিংবা ই-পাসপোর্ট ইস্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
বেনজীরের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত ইতিহাস : ১৯৮৮ সালে চাকরিজীবন শুরু করেন বেনজীর। তিনি তার পুরোনো হাতে লেখা পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর। সে সময় নীল রঙের অফিসিয়াল পাসপোর্ট না নিয়ে নেন সবুজ রঙের সাধারণ পাসপোর্ট। আসল পরিচয় আড়াল করে নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী বলে পরিচয় দেন। আবেদন ফরমে পেশা হিসেবে লেখেন ‘প্রাইভেট সার্ভিস’। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর বেনজীরকে নবায়ন করা এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) দেওয়া হয়। যার মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছিল ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর। যদিও মেয়াদপূর্তির আগেই ২০১৪ সালে ফের বেনজীর পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন। কিন্তু এবারও যথারীতি নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী বলে পরিচয় দেন। ২০১৪ সালে বেনজীর ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও তিনি অফিসিয়াল পাসপোর্ট নেননি। দ্বিতীয় দফায় নবায়ন করা পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পরে ২০১৬ সালে তিনি ফের পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন জমা দেন। সে সময় তিনি ছিলেন র্যাব মহাপরিচালক। সেবারও যথারীতি তিনি বেসরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দেন তার আবেদনে। সে দফায় পাসপোর্টে বেনজীরের তথ্য গোপন ও জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে যায়।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরে সূত্র জানায়, র্যাব মহাপরিচালকের বেসরকারি পাসপোর্ট দেখে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। কর্মকর্তারা পরে বিষয়টি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালকের নজরে আনলে বেনজীরের আবেদনপত্র আটকে যায়। তখন বেনজীরকে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দাখিল করতে বলা হয়। কিন্তু এনওসি জমা না দিয়ে পাসপোর্ট নবায়নের চাপ দেন তিনি। পরে সন্দেহজনক বিবেচনায় বেনজীরের বেসরকারি সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণের পক্ষে যথাযথ ব্যাখ্যা চেয়ে র্যাব সদর দপ্তরে চিঠি দেয় পাসপোর্ট অধিদপ্তর। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। চাপের মুখে একদিনের ব্যবধানে তাকে পাসপোর্ট দেয় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট বিভাগ (ডিআইপি)। ২০২০ সালে ২৮তম আইজিপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব নেন বেনজীর। নিয়মানুযায়ী সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু বেনজীর মর্যাদাপূর্ণ লাল পাসপোর্টও নেননি। আইজিপি হয়েও তিনি ফের বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। সে সময় দেশে চালু হয় ই-পাসপোর্ট। বেনজীরের আবেদন নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। তা সমাধান করতে তিনি আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে যাননি। অসুস্থতার কথা বলে পাসপোর্টের ডিআইপির মোবাইল ইউনিট চেয়ে পাঠান। পরে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তার বাসায় গিয়ে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়াসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালের ৪ মার্চ তার আবেদনপত্র জমা হয়ে যায়। ওই বছরের ১ জুন বেনজীরের নামে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।

