২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারের দিক থেকেও নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ম্যাচে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, অফসাইড নির্ধারণ কিংবা বলের স্পর্শ শনাক্তকরণÑ সব ক্ষেত্রেই যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এর ফলে রেফারিদের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুল হচ্ছে, একই সঙ্গে দর্শকেরাও পাচ্ছেন ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা।
স্মার্ট ফুটবলে লুকিয়ে আছে সেন্সর
এবারের অফিসিয়াল ম্যাচ বলে সংযোজন করা হয়েছে একটি ক্ষুদ্র ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট সেন্সর। এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার বলের গতি, দিক পরিবর্তন ও ত্বরণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে।
সংগৃহীত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও অপারেশন রুমে পাঠানো হয়, যেখানে অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ম্যাচ বিশ্লেষণ করা হয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো খেলোয়াড় ঠিক কখন বলে স্পর্শ করেছে তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। ফলে অফসাইড, হ্যান্ডবল কিংবা পেনাল্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে রেফারিরা বাড়তি সহায়তা পান।
ক্যামেরা ও এআইয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত
প্রতিটি স্টেডিয়ামে স্থাপন করা হয়েছে ১৬টি অপটিক্যাল ট্র্যাকিং ক্যামেরা, যা ম্যাচজুড়ে খেলোয়াড় ও বলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। এই ক্যামেরাগুলো প্রতি সেকেন্ডে বহু তথ্য সংগ্রহ করে এবং এআই সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য অফসাইড বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করে।
ফলে সহকারী রেফারিরা অনেক দ্রুত সংকেত পান এবং খেলার গতি অযথা ব্যাহত না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
খেলোয়াড়দের ৩ডি অবতার
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি ফুটবলারের ৩ডি স্ক্যান করা হয়েছে। এই তথ্য ব্যবহার করে ডিজিটাল অবতার তৈরি করা হয়েছে, যা রেফারিং সিস্টেম এবং টেলিভিশন সম্প্রচারে উন্নতমানের থ্রিডি রিপ্লে প্রদর্শনে সহায়তা করছে। এতে দর্শকেরা সহজেই বুঝতে পারছেন কোন খেলোয়াড় কোন পরিস্থিতিতে জড়িত ছিলেন।
দলগুলোর জন্য এআইভিত্তিক বিশ্লেষণ
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দেশকে দেওয়া হয়েছে ‘ফুটবল এআই প্রো’ প্ল্যাটফর্মের সুবিধা। এর মাধ্যমে কোচ ও বিশ্লেষকরা ম্যাচ-পরবর্তী দীর্ঘ প্রতিবেদনের অপেক্ষা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য, পরিসংখ্যান ও কৌশলগত বিশ্লেষণ পেতে পারেন। এই উদ্যোগের ফলে বড় বাজেটের দলগুলোর পাশাপাশি সীমিত সম্পদের দলও একই মানের বিশ্লেষণী প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে। ডেটা দিয়ে খেলোয়াড় মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি বিশ্বকাপে চালু হয়েছে নতুন ‘ফিফা পাওয়ার র্যাঙ্কিং’ ব্যবস্থা, যেখানে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স শুধুমাত্র মতামতের ভিত্তিতে নয়, বরং মাঠের বাস্তব তথ্য বিশ্লেষণ করে মূল্যায়ন করা হয়। আক্রমণ, সৃজনশীলতা, রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে বল নিয়ন্ত্রণ ও গোলরক্ষার দক্ষতার মতো সূচকের ভিত্তিতে রেটিং নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ম্যাচের পর তা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিশ্বকাপ
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে যে আধুনিক ফুটবল শুধু প্রতিভা ও কৌশলের ওপর নির্ভরশীল নয়; প্রযুক্তিও এখন খেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্মার্ট বল, এআইভিত্তিক অফসাইড শনাক্তকরণ, উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ এবং থ্রিডি ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি মিলিয়ে ফুটবল আরও নির্ভুল, স্বচ্ছ এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

