ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

প্রিপেইড মিটারে ২০০ ডিজিটের টোকেন : প্রযুক্তির অগ্রগতি নাকি নতুন জনভোগান্তি?

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও জনকল্যাণ বিশ্লেষক
প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সেবা পর্যন্ত প্রায় সবক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চালু করা হয় প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করা। কিন্তু সম্প্রতি প্রিপেইড মিটারে ২০০ ডিজিটের দীর্ঘ টোকেন চালুর পর নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা।

প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সূচনা ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল, মিটার রিডিং জটিলতা, দুর্নীতি ও বিল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই প্রিপেইড মিটার চালু করা হয়। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক আগে টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। ফলে মাস শেষে বিল নিয়ে ঝামেলা থাকে না এবং ব্যবহারকারী নিজেই বিদ্যুতের খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

প্রথমদিকে এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ মোবাইল ব্যাংকিং, বিকাশ, নগদ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজেই রিচার্জ করা যেত। ২০ ডিজিটের ছোট টোকেন নম্বর মিটারে ইনপুট করলেই দ্রুত ব্যালেন্স যোগ হয়ে যেত। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচত। কিন্তু নতুন করে ২০০ ডিজিটের টোকেন চালুর পর সেই সহজ প্রক্রিয়াই অনেকের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০ ডিজিটের টোকেন : নতুন বাস্তবতা

বর্তমানে অনেক প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীকে রিচার্জের সময় দীর্ঘ ২০০ ডিজিটের কোড ইনপুট করতে হচ্ছে। এই বিশাল সংখ্যার টোকেন টাইপ করা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। একটি সংখ্যা ভুল হলে পুরো টোকেন বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে আবার শুরু থেকে কোড টাইপ করতে হচ্ছে।

বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক, অল্পশিক্ষিত মানুষ, গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি চরম দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করেও সফলভাবে টোকেন ইনপুট করতে পারছেন না। ফলে বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।

প্রযুক্তির উদ্দেশ্য কি জটিলতা বাড়ানো?

প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে সহজ করা। একটি প্রযুক্তি তখনই সফল, যখন তা সাধারণ মানুষের সময় বাঁচায়, কাজের গতি বাড়ায় এবং ঝামেলা কমায়। কিন্তু কোনো প্রযুক্তি যদি মানুষের জন্য অতিরিক্ত জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি উন্নয়নের পরিবর্তে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাধারণ মানুষের বাস্তব ভোগান্তি

বাংলাদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে পুরোপুরি দক্ষ নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ এবং বয়স্ক নাগরিকদের জন্য স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ছোট স্ক্রিনে দীর্ঘ ২০০ ডিজিট দেখা ও টাইপ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।

শুধু তাই নয়, গ্রাহকদের মধ্যে মানসিক চাপও বাড়ছে। কারণ দীর্ঘ কোড ইনপুট করতে গিয়ে বারবার ভুল হচ্ছে। অনেকে আতঙ্কে থাকছেনÑ কোথাও ভুল হলে টাকা নষ্ট হবে কিনা। প্রযুক্তি যদি মানুষের মধ্যে স্বস্তির বদলে ভয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে সফল বলা যায় না।

গ্রাহকসেবার সীমাবদ্ধতা

প্রিপেইড মিটার নিয়ে সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলোÑ দুর্বল গ্রাহকসেবা ব্যবস্থা। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, সমস্যার সম্মুখীন হলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না। কল সেন্টারে ফোন দিলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার স্থানীয় অফিসে গেলেও অনেক সময় কার্যকর সহায়তা মেলে না।

ডিজিটাল উন্নয়ন ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ ডিজিটাল অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছেÑ এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রযুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের সামাজিক বাস্তবতা ও জনগণের সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা মানুষের প্রয়োজন ও সামর্থ্যরে সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

এই সমস্যার সমাধানে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, প্রথমত সহজ ও সংক্ষিপ্ত টোকেন ব্যবস্থা চালু। সেইসঙ্গে  স্বয়ংক্রিয় রিচার্জ ব্যবস্থা, যেমন মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস বা কিউআর কোডের মাধ্যমে সরাসরি মিটারে ব্যালেন্স যুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী কাস্টমার সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রতিটি এলাকায় দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য হটলাইন ও জরুরি সেবা চালুর কোনো বিকল্প নেই।

বিদ্যুৎ সেবা : নাগরিক অধিকার ও মানবিক প্রয়োজন

বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, যোগাযোগÑ সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদ্যুৎ সেবায় এমন কোনো পদ্ধতি চালু করা উচিত নয়, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।

একজন সাধারণ গ্রাহক প্রযুক্তির জটিল ব্যাখ্যা বুঝতে চান না। তিনি শুধু চান সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা গ্রহণ করতে। তাই প্রযুক্তিকে অবশ্যই মানবিক ও ব্যবহারবান্ধব হতে হবে।

প্রিপেইড মিটারে ২০০ ডিজিটের টোকেন ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও নিরাপদ হতে পারে। কিন্তু যদি সেই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। প্রযুক্তির সফলতা তখনই, যখন তা মানুষের দুর্ভোগ কমায় এবং জীবনকে সহজ করে।