পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা আতঙ্কে রয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন প্রভাবশালী বেনজীরের সহযোগীদের কেউ কেউ চাকরিচ্যুতি ও গ্রেপ্তারের ভয়ে আছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে পলাতক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বেনজীর ও তার সহযোগীরা গুম-খুন, নির্যাতনসহ নানান অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও কেউ কেউ গোপনে বেনজীরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, দিতেন নানান তথ্য। এখন বেনজীর গ্রেপ্তারে অনেকে গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সহযোগীরা বিদেশে পালাতে কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করেছেন। ইতিমধ্যে বিতর্কিত পুলিশের কর্মকতা মনিরুল ইসলাম, হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকারসহ ডজনখানেক বিদেশে পালিয়ে গেছেন। সেখানে আত্মগোপনে থেকেও তারা বেনজীরের যোগসাজশে পুলিশ বাহিনীতে অনুসারীদের দিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত ছিলেন। বিগত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান তারেক রহমানের সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তথ্য পাচার এবং নানা বিতর্কিত কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও গুমের বিভিন্ন অভিযোগে ইতিমধ্যে তার অনেক সহযোগীকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। বেনজীরের সহযোগীদের সর্বশেষ পরিস্থিতি নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের একাধিক সংস্থা নতুন করে তৎপর হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা বেনজীরের ব্যাপক অবৈধ সম্পদের উৎস ও মানি ট্রেইল অনুসন্ধানের সময় তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, রিয়েল এস্টেট পার্টনার এবং প্রশাসনিক সহযোগীদের নাম পেয়েছে। যদিও বেনজীর ও তার পরিবারের দেশত্যাগের পর থেকেই তার অনেক সহযোগী ও সুবিধাভোগী ব্যক্তি আত্মগোপনে চলে যান, তখন থেকেই তারা গ্রেপ্তারের ভয়ে রয়েছেন।
সাবেক এই পুলিশ-প্রধানের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে ও নির্দেশনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুমের একাধিক মামলায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অনেকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে প্রভাবশালীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। অধিকাংশ ভোল পাল্টে ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। পুলিশের বিভিন্ন পদে কর্মরত বেনজীরঘনিষ্ঠরা চাকরি হারানোর ভয়ে নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চাকরিতে বহাল থাকতে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতেও রাজি তারা। অনেকে ‘ম্যানেজ’ করে সুবিধামতো জায়গায় পোস্টিং নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বেনজীরের সহযোগীরাও যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক নজরদারিতে আসতে পারেন। ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তারের এই খবরের পর তার জ্ঞাত-অজ্ঞাত সহযোগী ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বেনজীরের পাশাপাশি তার সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করছে। সাবেক এই পুলিশ-প্রধানের অবৈধভাবে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। বেনজীরের ব্যবসার অংশীদার ও বেনামি সম্পত্তির দেখভালকারীরা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন।
বেনজীরের দুর্নীতি ও অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্য সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বেনজীর র্যাব ও পুলিশ-প্রধান থাকাকালীন তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব সদস্যকে ব্যবহার করেছিলেন। দেশে ফিরিয়ে এনে বেনজীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই তালিকায় আরও অনেক কর্মকর্তার নাম যুক্ত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
বেনজীরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আলোচিত পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম। গোপালগঞ্জে বেনজীরের ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’ গড়ে তোলার জন্য স্থানীয় সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষের জমি ভয়ভীতি দেখিয়ে কম দামে লিখে নিতে তৈমুর সরাসরি ভূমিকা রাখেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। বেনজীর আহমেদ ২০২২ সালে অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত তার বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর নির্মাণকাজ তদারকি ও দেখভালের জন্য পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তৈমুর ইসলাম বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ নজরদারিতে (ক্লোজড বা ওএসডি) রয়েছেন।
সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও বেনজীর আহমেদ তথ্য লুকিয়ে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। ২০১৬ সালে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এতে আপত্তি জানালে র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন কতিপয় প্রভাবশালী কর্মকর্তা চাপ প্রয়োগ করে সেই অবৈধ পাসপোর্ট ছাড়িয়ে নেন।
দুদক বেনজীরকে অবৈধ সম্পদ অর্জনে সরাসরি সায় দেওয়া, তথ্য গোপন করা এবং প্রটেকশন দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করছে। এই তালিকায় পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি ও র্যাবের তৎকালীন একাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে। পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, বর্তমান বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে বেনজীরের এসব কর্মকা-কে ‘ব্যক্তিগত অপরাধ’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বেনজীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার পুলিশ বিভাগকে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় তার বলয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। বেনজীর পুলিশ-প্রধান থাকাকালীন যে কতিপয় শীর্ষ কর্মকর্তা তার অপরাধমূলক সাম্রাজ্য ও অবৈধ পাসপোর্ট জালিয়াতিতে সরাসরি ছায়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তৎকালীন দুই অতিরিক্ত আইজিপিকে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বেনজীর আহমেদ র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন তার প্রভাব খাটিয়ে যারা ব্যক্তিগত ও ব্যাবসায়িক স্বার্থ হাসিল করেছিলেন, এমন একাধিক পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
তৎকালীন র্যাব সদর দপ্তর ও ডিএমপির প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তারা বর্তমানে চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসরে অথবা ওএসডি অবস্থায় আছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে এবং অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে গেছেন। বেনজীরের সম্পদ ও বিভিন্ন রিসোর্টের দেখভালকারী অরাজনৈতিক ব্যাবসায়িক সহযোগীদের বড় অংশই বর্তমানে লন্ডন, দুবাই ও কানাডায় পালিয়ে আছেন। যারা দেশে আছেন, তারা ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ হওয়ার পর থেকে দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন এবং যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।
বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জিশান মীর্জা এবং দুই কন্যা ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর দীর্ঘ সময় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করার পর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থান পরিবর্তন করছেন। তাদের নামেও ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলায় আইনি নজরদারিতে রয়েছেন।
এদিকে, বেনজীরের বিশ্বস্ত ও ডানহাত হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত নিলয় জোয়ার্দার বর্তমানে গুমের মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন। গত মাসে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ২৩ জুলাই দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের তথ্যানুযায়ী, বেনজীরের সহযোগী রিফাত নিলয় জোয়ার্দারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও প্রশ্রয়ে বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী মো. মশিউর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হয়। সেই সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়, যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখনই তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সহায়তায় দেশ ছেড়েছিলেন। বেনজীরকে দেশ ছেড়ে পালাতে সাহায্য করা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ সদর দপ্তর।

