ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

হারেনি কেউ জিতেছে দুই ইতিহাস

 ওমর ফারুক
প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৬:২৩ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল গোল-জয়ের হিসাবের খাতা নয়। এটি ইতিহাস, আবেগ, উত্তরাধিকার আর স্বপ্নের এক বিশাল মঞ্চ। এখানে কোনো কোনো ম্যাচের ফলাফল স্কোরবোর্ডে লেখা সংখ্যার চেয়েও অনেক বড় হয়ে ওঠে। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার ১-১ গোলের ড্র ঠিক তেমনই এক ম্যাচ। নব্বই মিনিটের লড়াই শেষে দুই দলই পেয়েছে একটি করে পয়েন্ট, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা রক্ষা করেছে আরও মূল্যবান কিছু, নিজেদের অর্জিত মর্যাদা, নিজেদের গড়ে তোলা ইতিহাস।

একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, যাদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো আর নেইমারের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে মরক্কো, এক সময় যাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ছিল কেবল অংশগ্রহণে, অথচ এখন যারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। এই দুই ভিন্ন ইতিহাসের দলের লড়াই শেষ হয়েছে সমতায়, কিন্তু সমাপ্তির বাঁশি বাজতেই মনে হয়েছে কেউ হারেনি, কেউ জেতেওনি।  বরং দুটি গল্প পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে আরও কিছুদূর।

ব্রাজিল : এক শতাব্দী ছুঁতে চলা ধারাবাহিকতা

বিশ^কাপ ফুটবলে ব্রাজিলের গল্পটি দীর্ঘ ও বিস্তৃত।বিশ্বকাপের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। ব্রাজিল তখনো ফুটবল সাম্রাজ্য হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ১৯৩৪ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর কখনো হারেনি সেলেসাওরা। প্রায় এক শতাব্দীর এই যাত্রাপথে কত কিংবদন্তি এসেছে, কত যুগ বদলেছে, কত বিশ্বকাপ কেটেছে, কিন্তু প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের অপরাজেয়তা থেকে গেছে অবিচল।

১৯৫৮ সালে এক কিশোর পেলে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে ফুটবলের সর্বকালের সেরা দলগুলোর একটি গড়ে উঠেছিল। ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে রোমারিও এবং রোনালদোদের হাত ধরে বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। মাঝখানে এসেছে ব্যর্থতা, এসেছে হতাশা, এমনকি ২০১৪ সালের জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্নও। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের তিক্ততা আর ফিরে আসেনি। মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের মাধ্যমে সেই রেকর্ড আরও দীর্ঘ হলো।

তবে এই ড্রয়ের মধ্যে ব্রাজিলের জন্য সতর্কবার্তাও রয়েছে। ম্যাচের বড় একটি অংশে তারা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ছিল না। মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব, রক্ষণে কিছু ভুল এবং আক্রমণে পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট ছিল। সৌভাগ্যবশত তাদের দলে ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ৩২ মিনিটে তার গোলই ব্রাজিলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ খারাপ খেলেও ফল বের করে আনা। ব্রাজিল অন্তত সেই সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে।

মরক্কো : রূপকথা নয়, বাস্তবতার নাম

অন্যদিকে, চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো যখন সেমিফাইনালে উঠেছিল, তখন বিশ্বের অনেক ফুটবল বিশ্লেষক সেটিকে ‘ফেয়ারি টেল’ বা রূপকথা বলে অভিহিত করেছিলেন। আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে ওঠা নিঃসন্দেহে ছিল অভাবনীয় ঘটনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মরক্কো প্রমাণ করেছে, সেটি কোনো আকস্মিক বিস্ময় ছিল না। বরং সেটি ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, উন্নত ফুটবল কাঠামো এবং এক প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারের সম্মিলিত পরিণতি।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে মরক্কো খেলেছে ঠিক সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই। তাদের খেলায় কোথাও কোনো ভয় ছিল না। মাঠে তারা প্রতিপক্ষের নাম দেখেনি, দেখেছে কেবল প্রতিপক্ষের জার্সি।

ম্যাচের ২১ মিনিটে ইসমাইল সাইবারির গোলটি যেন সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতীক। ব্রাজিলের রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে করা গোলটি শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, মরক্কো এখন আর ‘ডার্ক হর্স’ নয়, তারা এখন প্রতিষ্ঠিত শক্তি। এই ড্রয়ের ফলে মরক্কোর টানা অপরাজিত ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়াল ২৯। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি মানসিক শক্তির নাম। একটি দল যখন দীর্ঘ সময় হারতে ভুলে যায়, তখন তাদের মধ্যে জন্ম নেয় এক ধরনের বিশ্বাস, যে কোনো পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসা সম্ভব, যে কোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।

আফ্রিকার ফুটবল এক সময় বিশ্বকাপের মঞ্চে রোমাঞ্চ সৃষ্টি করত, কিন্তু ধারাবাহিকতা দেখাতে পারত না। মরক্কো সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। আজ তারা বিশ্বকাপে আসে শুধু অংশ নিতে নয়, শিরোপার দাবিদার হিসেবেই।

দুই মহাদেশ, এক আত্মমর্যাদা

এই ম্যাচটি ছিল আসলে দুই মহাদেশের ফুটবল বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার শতবর্ষী ঐতিহ্য, অন্যদিকে আফ্রিকার নবজাগরণের প্রতীক। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস গড়া হয়েছে কিংবদন্তিদের হাত ধরে। মরক্কোর ইতিহাস তৈরি হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের সাহস ও আত্মবিশ্বাসে।

ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি নিয়ে মাঠে নামে, মরক্কো তখন মাঠে নামে নিজেদের নতুন ইতিহাস লেখার সংকল্প নিয়ে। কিন্তু এই ম্যাচে দু’দলের মধ্যকার ব্যবধান প্রায় অদৃশ্য ছিল।

কখনো ব্রাজিল আক্রমণ করেছে, কখনো মরক্কো। কখনো ভিনিসিয়ুসের গতি, কখনো হাকিমির দুরন্ত দৌড়। দর্শকরা যেন এক নতুন বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছেন।  তারা অনুধাবন করেছেন, ফুটবলের মানচিত্র যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি শক্তির ভারসাম্যও।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এটাই। এখানে শুধু ট্রফি জয়ের গল্প লেখা হয় না. লেখা হয় আত্মপরিচয়ের গল্প, আত্মমর্যাদার গল্প।

মরক্কো এই ম্যাচ থেকে শিখেছে, তারা এখনো বিশ্বের সেরাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে। ব্রাজিল শিখেছে, ঐতিহ্য যত বড়ই হোক, তাকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়।

একটি দল রক্ষা করেছে ২৯ ম্যাচের অপরাজেয় অভিযাত্রা। আরেকটি দল ধরে রেখেছে ৯৩ বছরের বিশ্বকাপ-শুরুর গৌরবগাথা।

স্কোরবোর্ডে লেখা আছে ১-১। ইতিহাসের পাতায় হয়তো এটি খুব বড় কোনো ফলাফল নয়। কিন্তু ফুটবলের গভীরতর গল্পে এই ম্যাচ স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুটি ধারাবাহিকতার মিলন হিসেবেÑ একটি উদীয়মান শক্তির, অন্যটি চিরায়ত সাম্রাজ্যের।

শেষ বাঁশি বাজলেও তাই হারেনি কেউ। মরক্কোর স্বপ্নের ডানা অক্ষত আছে, ব্রাজিলের ঐতিহ্যের প্রদীপও জ্বলছে আগের মতোই।

আর বিশ্বকাপ? সে আবারও প্রমাণ করলÑ ফুটবল কেবল জয়ের খেলা নয়, এটি মর্যাদা রক্ষারও এক অনন্ত মহাকাব্য।