ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কবি, গবেষক ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী আর নেই। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
কবির ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তার বাবা। গত বুধবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রক্তে সংক্রমণ (ব্লাড ইনফেকশন), কিডনি ও হার্ট ফেইলিওরের পাশাপাশি একাধিকবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় তার। শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে আবারও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে চিকিৎসকরা শক থেরাপি দেন, তবে শেষরক্ষা হয়নি। বেলা দেড়টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নারুচি গ্রামে আল মুজাহিদীর জন্ম। তার বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন একজন নাট্যকার, সংগঠক ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী; যিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণও করেছিলেন। মা সাখিনা খান ছিলেন গীত রচয়িতা ও সমাজকর্মী।
পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহ ও বাবার বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন আল মুজাহিদীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনিও কারাবরণ করেন। পরে ১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়ার সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন আল মুজাহিদী। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দুইবার স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
আল মুজাহিদী ছিলেন একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও শিশুসাহিত্যিক। নিজের কাব্যশৈলীতে তিনি ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ায় তার কবিতায় নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যিক উপাদানের সুনিপুণ ব্যবহার দেখা যায়।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ নিয়ে প্রয়াত সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান মন্তব্য করেছিলেন, প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকাবোধের প্রতি আল মুজাহিদীর প্রবল আকর্ষণ ছিল এবং তিনি কখনো নিজের মাটিকে ভোলেননি। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।
আল মুজাহিদী পেশাজীবনে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে তিনি ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সর্বশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষাণ¥াসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘নতুন এক মাত্রা’।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরেবাংলা সংসদ পুরস্কার এবং জয় বাংলা সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন