আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক বছরে (২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর) দেশে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এ সময় দেশের সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট অফিসে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হতে হয় সেবাপ্রত্যাশীদের। এর পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ তথ্য তুলে ধরেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, পাসপোর্ট সেবায় সর্বোচ্চ ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রাহক দুর্নীতির এবং ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হয়েছেন; অন্যদিকে বিআরটিএতে এই দুর্নীতির হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ঘুষের হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। খাতভেদে সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া খাতভেদে সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৮৭ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ। পাসপোর্ট অফিসের পর বিআরটিএতে সেবা খাতগুলোর মধ্যে ঘুষের হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে সেবা গ্রহণে বিআরটিএতে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার গ্রামাঞ্চলে ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
টিআইবি জানায়, খাতভেদে সেবা গ্রহণে ঘুষের শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছেÑ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, কৃষি ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ভূমি ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ, স্বাস্থ্য (সরকারি) ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ২১ দশমিক ৯ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, গ্যাস ৬ শতাংশ, কর ও শুল্ক ২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিমা ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
এদিকে খাতভেদে সেবা গ্রহণে দুর্নীতির শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ভূমি ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য (সরকারি) ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ, কৃষি ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ৪৬ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ, বিমা ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ, গ্যাস ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং কর ও শুল্ক ১১ দশমিক ২ শতাংশ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সার্বিকভাবে দেশের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অন্তত একটি খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে। আর সার্বিকভাবে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সেবা গ্রহণে কমপক্ষে একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পাসপোর্ট খাতের চিত্রটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছর খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার ১২৪ টাকা।
তিনি বলেন, দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের মতে, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারেরই দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে এই জরিপ করেছে টিআইবি। জরিপে সুনির্দিষ্ট ১৮টি সেবা খাতের চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে ২০২৩ সালে এই জরিপ করেছিল টিআইবি। বর্তমান জরিপের ফলাফল বলছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ) ও বিআরটিএ (৬৩ দশমিক ৫) থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা। এসব খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি। তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছর খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার ১২৪ টাকা।

