আগামীকাল বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স এবং নরওয়ে। এই ম্যাচকে ছাপিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের দুই অবিসংবাদিত তারকা আরলিং ব্রট হালান্ড এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে। একদিকে নরোয়েজিয়ান ভাইকিংদের অদম্য শারীরিক শক্তি ও গোলক্ষুধা, অন্যদিকে ফরাসিদের গতি, নান্দনিকতা ও চতুরতা। চলমান টুর্নামেন্টে দুজনেই রয়েছেন অতিমানবীয় ফর্মে। নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে দুজনেই করেছেন দুটি করে জোড়া গোল। স্বভাবতই এই দ্বৈরথকে কেন্দ্র করে ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে গভীর ট্যাকটিক্যাল ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
দ্বৈরথের পটভূমি
ঐতিহাসিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের ঐতিহ্য ও ট্রফি ক্যাবিনেট নরওয়ের তুলনায় ঢের সমৃদ্ধ। ফরাসিরা যেখানে একাধিক বিশ্বকাপ ও ইউরো জয়ের গৌরবে দীপ্ত, নরওয়ে সেখানে দীর্ঘদিন বড় মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরার লড়াই চালিয়েছে। তবে সমসাময়িক ফুটবলে নরওয়ের উত্থানের পেছনে এককভাবে বড় ভূমিকা রাখছেন আরলিং হালান্ড। বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্সকে ধরা হয় সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রতিভায় ঠাসা দল হিসেবে। অন্যদিকে নরওয়ে তাদের সোনালি প্রজন্মের হাত ধরে ইউরোপের শীর্ষ দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্তিমত্তা অর্জন করেছে। ফলে এই ম্যাচটি শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের অলিখিত পরীক্ষা।
ফর্মে দুই গোলমেশিন
চলমান টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দুই স্ট্রাইকার যেন একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার নিখুঁত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। প্রথম দুই ম্যাচের পরিসংখ্যান ও মাঠের পারফরম্যান্স অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়। আরলিং হালান্ড তার প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করে নরওয়ের আক্রমণভাগের মূল স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার গোলগুলোর পেছনে ছিল বক্সে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের শারীরিক শক্তিতে পরাস্ত করার নর্ডিক কৌশল। বিপরীতে, কিলিয়ান এমবাপ্পেও সমসংখ্যক ম্যাচে চার গোল করে ফ্রান্সের জয়ের ধারা বজায় রেখেছেন। তবে এম্বাপ্পের গোলগুলোর ধরন ভিন্ন; সেখানে ছিল তার অতিমানবিক গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে গোলরক্ষককে বোকা বানানোর সহজাত ফরাসি চতুরতা। দুজনেই যখন শতভাগ ফর্মে থাকেন, তখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কৌশল পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বাধ্য।
ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়
ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার হালান্ড মূলত প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতর এক ত্রাস। নরওয়ের খেলার মূল চালিকাশক্তিই হবে হালান্ডকে কেন্দ্র করে। নরোয়েজিয়ান কোচ সাধারণত এমন ফর্মেশন বেছে নেন যেখানে উইং এবং মাঝমাঠ থেকে ক্রমাগত ক্রস ও থ্রু পাস সরবরাহ করা হয় হালান্ডের উদ্দেশ্যে। ফ্রান্সের হাই-লাইন ডিফেন্সের বিরুদ্ধে হালান্ডের শারীরিক শক্তি এবং গতি বড় পরীক্ষা নেবে। ফরাসি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের জন্য হালান্ডকে বোতলবন্দী করা হবে অন্যতম কঠিন কাজ। হালান্ড সাধারণত হাফ-চান্সগুলোকে গোলে পরিণত করতে ওস্তাদ, তাই ফরাসি ডিফেন্সের সামান্য মনোযোগহীনতা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। বিশেষ করে সেট-পিস এবং কর্নার কিকের সময় হালান্ডের হেডিং ক্ষমতা নরওয়েকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
ফরাসি ব্লিৎজক্রিগ
কিলিয়ান এমবাপ্পেকে আটকানোর কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র আজ পর্যন্ত কোনো রক্ষণভাগ নিখুঁতভাবে আবিষ্কার করতে পারেনি। নরওয়ের রক্ষণভাগ কিছুটা ভারী এবং শারীরিক গঠনে শক্তিশালী হলেও, ক্ষিপ্রতা বা গতির দিক থেকে তারা কিছুটা ধীরগতির।
আর এখানেই আছে এমবাপ্পের মূল শক্তির জায়গা। এম্বাপ্পে যদি বাঁ দিক থেকে কাট-ইন করে ভেতরে ঢোকার জায়গা পেয়ে যান, তবে নরওয়ের রক্ষণভাগের জন্য তা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তা ছাড়া ফ্রান্সের মাঝমাঠের গভীরতা নরওয়ের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। মিডফিল্ডাররা বলের দখল রেখে যখন কাউন্টার অ্যাটাকে এমবাপ্পেকে বল বাড়িয়ে দেবেন, তখন নরওয়ের ডিফেন্সলাইনকে ব্যাকফুটে চলে যেতে হবে। এম্বাপ্পের গতি রুখতে নরওয়েকে হয়তো লো-ব্লক ডিফেন্স বা রক্ষণাত্মক প্রাচীর তৈরি করে খেলতে হবে।
কৌশলগত দাবার চাল
ফ্রান্সের অভিজ্ঞ কোচ দিদিয়ে দেশম দীর্ঘ সময় ধরে দলটিকে পরিচালনা করছেন এবং তিনি জানেন কীভাবে বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে হয়। দেশম চাইবেন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে নরওয়ের আক্রমণভাগের সরবরাহ লাইন কেটে দিতে। বিশেষ করে মিডফিল্ডার যাতে হালান্ডকে বল জোগান দিতে না পারেন, সেই পরিকল্পনা থাকবে ফরাসিদের।
অন্যদিকে, নরওয়ের কোচ হয়তো কিছুটা বাস্তববাদী কৌশল অবলম্বন করবেন। তিনি বল পজিশন ফ্রান্সকে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের রক্ষণভাগ নিরেট রাখতে চাইবেন এবং কাউন্টার অ্যাটাকে হালান্ডের অতিমানবীয় গতির ওপর ভরসা রাখবেন।
সম্ভাব্য ফলাফল
ফুটবলের আধুনিক ব্যাকরণ এবং শক্তির গভীরতা বিবেচনা করলে এই ম্যাচে ফ্রান্সকে কিছুটা এগিয়ে রাখতে হবে।ফরাসি দলে কিলিয়ান এমবাপ্পে ছাড়াও উসমান ডেম্বেলে বা গ্রিজম্যানের মতো অভিজ্ঞ ও ম্যাচ উইনার ফুটবলার রয়েছেন, যা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। নরওয়ের বড় দুর্বলতা হলো তারা অতিরিক্ত মাত্রায় হালান্ড-নির্ভর। যদি ফ্রান্সের রক্ষণভাগ হালান্ডকে সফলভাবে নজরে রাখতে পারে, তবে নরওয়ের পক্ষে গোল পাওয়া কঠিন হবে। বিপরীতে, ফ্রান্সের বহুমাত্রিক আক্রমণভাগকে ৯০ মিনিট আটকে রাখা নরওয়ের ডিফেন্সের জন্য এক প্রকার অসম্ভব পরীক্ষা। তবে ফুটবলে নিশ্চিত বলে কিছু নেই।

