২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়নকাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। আগামী ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। জুলাই-মের হিসাবে এই বাস্তবায়নের হার গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। গতকাল বৃহস্পতিবার বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে এই চিত্র পাওয়া গেছে। জুলাই-মে সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা। টাকার অঙ্ক ও বাস্তবায়নের হারÑ উভয় দিক বিবেচনা করলেও গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভোটের আগে দেশে উন্নয়নকাজের ধুম পড়ে যায়। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ক্ষমতাশীল সরকার সারা দেশে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
সবশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা গেছে; একটার পর একটা উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা যায়নি। সে কারণেই বর্তমান সরকারের উন্নয়নকাজেও বেশ মন্থরগতি দেখা যাচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ১ হাজার ৭৬৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে; যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ১০ হাজার ২৪২ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। অর্থবছরের মোট বরাদ্দের হিসাবে এই ১১ মাসে বাস্তবায়নের হার ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
আইএমইডির ওয়েবসাইটে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ের হিসাব দেওয়া আছে। পুরোনো তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১৬ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম বাস্তবায়নের হার। এই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়। এবার তা ৫০ শতাংশের কম হলো। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এমনিতেই সক্ষমতার অভাব আছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং টাকা খরচে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কর্মকা-ে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পসহ এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা করা হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এডিপির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রতি বছর বাজেটের সময় এডিপির মাধ্যমে এসব মন্ত্রণালয়ের চলমান ও নতুন প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১১ মাসের প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। যেমনÑ সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু গত ১১ মাসে এক টাকাও খরচ করা সম্ভব হয়নি। সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার শূন্য।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাস সময় পেরিয়ে গেলেও নিজেদের প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দের ২৫ শতাংশও খরচ করতে পারেনি ছয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পারফরম্যান্স সবচেয়ে দুর্বল। সংসদবিষয়ক সচিবালয় ছাড়া তালিকায় থাকা অন্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় হলোÑ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ; জননিরাপত্তা বিভাগ; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার সম্পদ বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগ।

